Book Review

Review copyright reserved with the Centre for Language, Translation & Cultural Studies, Netaji Shubhas Open University,  Kolkata. No part of this online publication may be reproduced in any form without the written permission of the Author and the Centre.
 
 
  • অশেষ
  • ছেঁড়া শিকড়
  • Partition-Jinnah Gandhi
  • আগুনমুখার মেয়ে
  • সেকালের কথা
  • Noahkhalir Durjoger Dine
  • একাত্তরের ডায়েরী
  • একালে আমাদের কাল
  • শেষ পারানির কড়ি
  • সুপুরিবনের সারি
  • এপার-ওপার
  • নোয়াখালির ইতিহাস
  • Coming out of Partition: Refugee Women of Bengal
  • ভাগফল ৭১ মেয়েদের কথা
  • প্রসঙ্গ: পি এল ক্যাম্প
  • সেই তো আমার আমি
  • Mapmaking : Partition Stories from Two Bengals
  • উজানতলীর উপকথা : শিকড়ের সন্ধান
  • একাত্তরের দিনগুলি
  • রূপকথার ট্যাংরা কলোনি
  • যখন যা মনে পড়ে
  • দেশভাগ: স্মৃতি আর স্তব্ধতা
  • বিপন্ন কালের ভেলা
অশেষ

অশেষ
সুজয় চক্রবর্তী
প্রকাশক: খেয়া, বীরনগর, নদিয়া
প্রথম প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০১৫.।। পেপারব্যাক

 

বইটি লেখকের আত্মজৈবনিক রচনা। প্রস্তাবনা, আমাদের কথা, প্রাক্-কথন, পেরিয়ে মূল কাহিনির যাত্রা শুরু। পটভূমি ২য় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্ব থেকে দেশভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। মোট ৬টি পর্বে বিন্যস্ত পেপারব্যাকটি পৌঁছে দেয় বিলুর শৈশব থেকে প্রথম ভালোবাসায়। অনায়াসে। শৈশবের আতঙ্কের দিনলিপি ক্রমশ পাল্টাতে থাকে। আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সামিল হয় বিলু।

প্রথম অধ্যায় “শৈশবকথা”: বিলুর শৈশব আবর্তিত হয়েছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বিদেশি সেনাদের ফিরে যাওয়া, চলাচল, অত্যাচার ইত্যাদির মাঝে। মাত্র ন’মাস বয়সে পিতৃহারা বিলুর। পরম স্নেহে মা আর দাদা-দিদিরা লালন করে পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানকে । উঠে আসে সমাজজীবনের নানা টানাপোড়েনের সঙ্গে  ১৯৪৬-এর কালান্তক দুর্ভিক্ষের এক ভয়াবহ ছবি।

দ্বিতীয় অধ্যায় “আতঙ্কের রাতদিন: স্বাধীনতা লাভের আনন্দ কিভাবে দেশ তথা জাতিভাগের যন্ত্রণায় পরিণত হয়, বিলু তা টের পায়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, জাতিবিদ্বেষ, গুজব আর সংঘর্ষ হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। ছোট্ট বিলুর চোখে ধরা পড়ে কেমন করে চেনা মুখগুলো অচেনা হয়ে যায়, ভালো মানুষগুলো এক বিপন্নতাবোধে ভুগতে থাকে। নানান স্বার্থের সংঘাত জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। একদল মানুষ ঘর ছাড়ার কথা ভাবেন, আরেক দল হিসেব কষে কে কোনটা দখল নেবে তার।

তৃতীয় অধ্যায় “বাস্তুহারানোর কাহিনি”: এত টানাপোড়েনের মধ্যে কলকাতা বিলুকে ডাকে। যেন স্বপ্নের দেশ। কলকাতা যাবে শুনে বিলুর মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। হিন্দুদের দোকান লুঠ, বাড়িতে আগুন লাগানোর মধ্যে দেশভাগ নিশ্চিত হয়ে যায়। বিলুর আত্মীয় পরিজনও দেশ ছেড়ে কলকাতা চলে গেল। দেশবিভাগের ভয়ঙ্কর পরিবেশ বিলুকেও দেশান্তরী ক’রে ছাড়লো।

চতুর্থ অধ্যায় “ পরবাস-পথে”: ঘোড়ার গাড়ি পল্টন পেরিয়ে রমনার ময়দান হয়ে ঢাকেশ্বরী কালীমন্দির কার্জন পার্ক ছাড়িয়ে ফুলবাড়ি স্টেশনে এসে পৌঁছায়। থিক থিক করা ভিড়। বিলুর মা-র দু-চোখ বেয়ে জল ঝরতে থাকে। এখন বিলুও দেশত্যাগী রিফিউজি।নারায়ণগঞ্জ স্টেশনে নেমে স্টিমারে বুড়িগঙ্গা আর মেঘনা পেরিয়ে মুন্সিগঞ্জ। ওখান থেকে গোয়ালন্দ। ঘাটের কাছেই স্টেশন। এখানে পদ্মা-যমুনার সঙ্গমস্থলটি দেখবার মতো। ট্রেন গোয়ালন্দ ছেড়ে দর্শনা-মাজদিয়া-বগুলা-আড়ংঘাটা হয়ে পৌঁছায় রানাঘাট জংশনে। চলতে চলতে শিয়ালদা।

পঞ্চম অধ্যায় “হায় স্বাধীনতা”: ক’টা দিন কাটতে না কাটতেই চলে আসে স্বাধীনতা। বিরাট মিছিল আর গালভরা শ্লোগানে গমগম করে রাজপথ। বিলুর মা ডুকরে কেঁদে ওঠেন – “ এটা কি স্বাধীনতা? হাজার-হাজার মানুষরে ভিটা-ছাড়া পথের ভিখারির মতো কইরা যে স্বাধীনতা তার জন্য আনন্দ কীসের?” বাস্তুচ্যুত উদ্বাস্তুদের জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই চলতে থাকে। বিলুর যাযাবর জীবন কাটে সোনারপুরে, উত্তরপাড়ায়, কৃষ্ণনগরে। সে সময় অনেক মুসলিমও জলের দরে জমিজায়গা বেচে দিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানে চলে যায়। বিলুর পড়াশুনো চলতে থাকে।

ষষ্ঠ অধ্যায় “প্রথম ভালোবাসা”: এ দেশে আসার প্রায় বছর পাঁচেক পর কিশোর বিলু একবার বাঁকুড়া যায়। দাদার কাছে। অষ্টমশ্রেণির বিলুর জীবনে আসে প্রথম ভালোলাগা -- এক কিশোরী, সোহিনী। বয়ঃসন্ধির টুকরো প্রেমের চমকে শেষ হয় ‘অশেষ’ জীবন-কথা।

২০১৪-র ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সুজয় চক্রবর্তীর জীবনাবসান হয়। ঠিক মৃত্যুর আগে তিনি ৮৮ পৃষ্ঠার এই বইটি লেখেন আর তাঁর মৃত্যুর পর তিন কন্যে তা প্রকাশ করে একটি মহৎ কাজ করেন।

 

দূর্বাদল দত্ত
সহকারি শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ
যমশেরপুর বি এন হাই স্কুল
বাগচী-যমশেরপুর, নদীয়া। ৭৪১১২২

 

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

ছেঁড়া শিকড়

ছেঁড়া শিকড়
অঞ্জলি দাশ

 

‘একালের রক্তকরবী ৪৬’-এ (আগষ্ট ২০১৪-সেপ্টেম্বর ২০১৫ সংখ্যায়) প্রকাশিত অঞ্জলি দাশের “ছেঁড়া শিকড়” একটি আত্মকথা। স্বাধীনতা তথা দেশভাগের যন্ত্রণাবিদ্ধ’৪৭ –পরবর্তি অধ্যায়ের পটভূমিতে রচিত স্মৃতিকথার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ব্যক্তিমানুষের নিয়ত অভিজ্ঞতার বাঁক, সময়ের অভিঘাত, সমাজমানসে তার প্রতিফলন।  স্থান ও কালের নিরিখে ইতিহাস মেলে ধরে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে। পৌঁছোতে পারে না ব্যক্তিমানসের চৈতন্য-প্রবাহে সমাজ-সভ্যতার ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের যে বহুমাত্রিক অভিঘাত স্মৃতিতে অমলিন তার কাছে। ইতিহাসের এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার আলোয় যে কাহিনি রচিত হয় তা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সেদিক থেকে বিচার করলে অঞ্জলি দাশের “ছেঁড়া শিকড়” এক মর্মস্পর্শী আত্মকথন।

লেখিকার মানসপটে ধরা পড়েছে সাতচল্লিশ-পরবর্তি সময়কালে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে সমাজমানস ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে, ধর্মীয় পরিচয় ও জাতিসত্তাকে, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বিশ্বাসকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে; হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে আতঙ্কের আগুনে পুড়িয়েছে, দেশান্তরী করে পরিচয়হীন-বাস্তুহারা মানুষে পরিণত করেছে, শত শত স্পর্ধিত তাজা তরুণকে নির্মমভাবে বলি দিয়েছে, অগণিত তরুণীকে ধর্ষিতা বানিয়েছে তারই যন্ত্রণাবিদ্ধ কাহিনি।

অঞ্জলির এই আত্মকথা বহন করে  ভালোবাসা আর বিচ্ছেদ মাখামাখি সেই মাটি যা তাঁর মননের ঘাসজমিতে প্রাণরস জোগায় আজও; সীমান্তের এক হাত দূরে শান্ত শুয়ে থাকা সেই নদী যার নাম ‘অশ্রু-ধারাবতী’ আর বর্ণময় ভাঙাগড়ার আখ্যান। তিনি সন্ধান করেছেন কিভাবে মানবিক সম্পর্কের বিষবাষ্পে সীমান্তের দুই পারের দুই মানুষের মাঝের বাতাস ভারী হয়েছে। এই আঘাতের মাঝে সহজাত আত্মীয়তাটুকুও হারিয়ে গেছে। তাই তিনি খুঁজতে চান নি  অশ্রুবিন্দুর উৎস। চারপাশে কান পেতে শুনেছেন উৎখাত হওয়ার  রোষ আর বিদ্বেষে শানানো দেশ ছাড়ার ইতিবৃত্ত। ইতিহাস তার অবয়ব আর স্মৃতি অন্তঃসলিলা ফল্গুধারা, যাকে ইতিহাসের পাতা ব্যক্ত করতে পারে না। ইতিহাসের দৃষ্টি মানুষের অন্দরে পৌঁছোয় না। তাই বুঝি স্মৃতি কখনও কখনও ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই আত্মকথা এক ‘শিকড় ছেঁড়া গাছের কথা’, ‘উপরে ফেলা শিকড়ের অন্তঃক্ষরণ’। এখানে  লেখিকা তাঁর বুকের ভিতরে জমে থাকা অব্যক্ত অনুভূতির বাষ্পে গড়া বরফ-পাহাড়কে গলিয়ে এক স্রোতস্বিনী বানিয়েছেন যা তাঁর ফেলা আসা সময়কে আবহমানের সঙ্গে বইয়ে দেয়।তিনি মনে করেন ‘স্মৃতি তো আসলে সময়ের গ্রন্থিতে আটকে থাকা কিছু দৃশ্যকল্প’। তাই দুটি চমৎকার দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ‘জীবনের একটা দীর্ঘ সময়ের পারিপার্শ্বিকতার খণ্ডচিত্র’। আপাত অগোছালো আত্মকথনে কবিতার স্বতঃস্ফূর্ততায় ভালোলাগা আর কষ্টকথা মিলেমিশে একাকার।

প্রথম দৃশ্যকল্পে উঠে এসেছে ছোটবেলা – হেমন্তের ছবি, অঘ্রাণের ঘ্রাণ, কীর্তন-পালাগান, নানান লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান, কবিগান, রয়ানী (মনসামঙ্গলকে কেন্দ্র করে লোকগান), রামযাত্রা, মেলা, ব্রত-পালন,কালো চামর হাতে ফকিরের ‘মুশকিল আসান’-এর দোয়া, গাজন, নবান্ন, মাঠ-ঘাট-বাগান-বাড়ি, শৈশবের আনন্দমুখর দিনরাত্রি। এক্কাদোক্কা, গোল্লারছুট, বকুলবেলা, কচি আমের খোসা ছাড়ানো, ঋতুরঙ্গ, শিউলির গন্ধমাখা সকাল-এর পথ ধরে মহালয়া, দুগ্গা-প্রতিমার খড়ের শরীর, ভাইবোন মিলে দরজির দোকানে গিয়ে পোশাকের মাপ দেওয়া, পুজোর ছুটিতে নছিম মাঝির নৌকোতে চেপে ভৈরব নদীর আঁকাবাঁকা পথে গ্রামের বাড়ি সুলতানপুরে যাওয়া। মুক্ত আনন্দে ভরপুর অপরূপ শৈশবের দিনগুলো কেটেছে  খুলনা মহকুমার বাগেরহাটে আর সুলতানপুরে। নিস্তরঙ্গ গ্রামের মানুষের আনন্দ-উচ্ছাস, উষ্ণ-আলিঙ্গন, পুকুর পাড়ের মজা, ছিপ দিয়ে মাছ ধরা, পুকুরের টলটলে জল পান, আম-কাঁঠালের বাগানের শান্ত ছায়া, জিরেন কাঠের খেজুর রস – এ সবই এক নির্মল শৈশবের ছবি আঁকে। উৎসবের দিনগুলোতে হিন্দু-মুসলমান সকলে মিলে মেতে উঠতো অনাবিল আনন্দে। এর মাঝে রামায়ণ-মহাভারত-এর গল্প শোনা, বর্ণচেনা, পড়া আর আওড়ানো থেকে আবৃত্তি, সঞ্চয়িতা-রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে বিদ্যারম্ভ।

দ্বিতীয় দৃশ্যকল্প জুড়ে আছে স্কুল-কলেজের জীবন আর ইতিহাসের নির্মম কষাঘাত। পঁয়ষট্টির ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বিষফল ফলে। হিন্দু মেয়েরা অন্যদের থেকে আলাদা জোট করে থাকতো। কিছু মুসলিম মেয়ে তো ‘তোদের ইন্ডিয়া’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতে লাগলো হিন্দু মেয়েদের উদ্দেশে। দুই প্রতিবেশির মাঝখানে প্রকট হতে লাগলো বিভেদের আগ্নেয়গিরি। লেখিকার চোখে ধরা পড়েছে বৈষম্যের স্ফুলিঙ্গ। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মেরুকরণ হতে থাকলো। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ‘ভগবান সামনে এলেই মানুষ ভাগ হয়ে যায়’। প্রতিটি ২১-শে ফেব্রুয়ারি আসে আর মুক্তিকামী মানুষেরা আশায় বুক বাঁধে। কলেজ জীবনটাতে তিনি উত্তাল একাত্তরের আঁচ অনুভব করেন। স্লোগানে মুখরিত হয় আকাশ বাতাস। প্রতিদিনঐ মিছিলের দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। বয়ঃসন্ধির এই সময়কাল আলোড়ন তোলে আবার শঙ্কা জাগায়। পাকিস্তানপন্থী রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার বাড়তে থাকে। অন্যদিকে মুক্তিকামী মানুষের গণজাগরণ ঘটে। রহমান কাকা সাময়িক আশ্রয় দিলেও চরম উৎকন্ঠা, সংশয় আর বিপর্যয়ের মাঝে দালালের মাধ্যমে রাত্রির অন্ধকারে দেশ ছাড়েন সপরিবারে। পরিচয়হীন বাস্তুহারা শরণার্থীর তকমা জোটে ভারতে। কি করুণ সেই সব অনিশ্চয়তায় ভরা দিনরাত্রির স্মৃতি! আবার মাটির আমোঘ টানে ফিরে যান সদ্য স্বাধীন অভাবজর্জর বাংলাদেশে। গিয়ে দেখেন চারপাশে ‘নেই’ আর ‘নেই’। বাড়ি আছে তো ঘর নেই, ঘর আছে তো জানলা-দরজা নেই; কোথাও পোড়া বাড়ি। চিরতরে হারিয়ে গেছে কত চেনা মুখ। ধর্ষিতা মুসলিম মেয়েদের বিবর্ণ মুখ। কলেজের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাইকোলজি বিভাগে। পড়া শেষ করে বাড়ি ফেরেন। দেখেন অনেক চেনা হিন্দু পরিবার ভারতে চলে গেছে। কোথায় যেন তাল কেটে গেছে। টের পান একটা চোরাস্রোত কেবলই পায়ের তলার মাটিকে আলগা করে দিচ্ছে। টান লাগছিল শিকড়ে। স্বদেশে পরবাসী। যেন এত দিনের যাপন সত্ত্বেও না আছে কোনো অধিকার, না কোনো দাবী। পরিণামে নতুন মাটির সন্ধানে শিকড় উপরে ভারতে আসা। আবার নতুন করে শুরু করা।

বাস্তুহীনতার এই যন্ত্রণাবিদ্ধ স্মৃতির অতি স্বচ্ছন্দ, সাবলীল, কাব্যিক প্রকাশ এই আত্মকথা যাকে তিনি ‘জীবনকথা’ আখ্যা দিতে চাননি। দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্যে অঞ্জলি দাশ-এর এই লেখাটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

 

দূর্বাদল দত্ত
সহকারি শিক্ষক
যমশেরপুর বি এন হাই স্কুল
বাগচী-যমশেরপুর, নদীয়া। ৭৪১১২২

 

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

Partition-Jinnah Gandhi

Jinnha’s speech of August 11, 1947 and Gandhi’s Pilgrimage for undoing the spirit of Partition
Short Title: Partition-Jinnah Gandhi

Author: Amarendranath Basu
Publisher: Sribhumi Publishing House
Pages: 302
Price: Rs 400.00
         US $11.00

 

The book starts with an invocation from the Upanishad and a prayer to the Almighty to lead men from “untruth to truth”. It is dedicated to the memories of people and homeland: how tragedies befall when men and women, the old and the young are forced to migrate. The violence that engulfed the Partition of the subcontinent and led to the acquiring of a new national identity has been reduced to mere statistic:  millions of people got displaced and thousands were killed and raped. But the book is neither a historiography of Partition nor a biographical work on Jinnah and Gandhi. Unlike other books, it makes an attempt to walk towards a brighter future marked with accord, amity and peace. Gandhi’s views and Jinnah’s dreams envisaged in his August 11, 1947 speech where he underscored the need of a secular and democratic foundation for his new country could serve as the beacon light for a better life in this world rent with strife and strain. According to the author, Gandhiji’s policy of Ahimsa is the only antidote to these problems. Though he has given a detailed account of the mayhem that followed immediately after the declaration of the Partition, yet throughout the book he has upheld the spirit of oneness and universal peace which finds its culmination in the fourteenth chapter- Lest we forget! Dr. Basu hits the nail on the head in chapter fourteen when he warns in no uncertain terms and reiterates the need to remember our past which is mistakenly viewed as a single event that occurred in Punjab and Bengal in the months that preceded and succeeded the formation of the Indian and Pakistani nation states. The two states  have preferred to celebrate the singular experience of the birth of the two nations giving rise to more bitterness. Lest we forget, we are to know ourselves in what depth we had reached and made ferocious beasts of ourselves. Otherwise how our future generations would be able to correct and lift themselves to true manhood, argues Basu logically.Apart from giving future direction to the people he has also carefully interwoven the genesis of the armed struggle against the British Rule since 1857 and similar other movements that followed in the Indian soil and abroad under the commendable guidance of Netaji Subhash Chandra Bose. Gradually, we find the non-violent movement acquiring prominence under the Leadership of Mahatma Gandhi.He gave Indians the new concept of freedom and world-peace.Though the promises made by Jinnah in his speech were never implemented in Pakistan, the book chronicles the transformation of Jinnah from communal to secular during the last days of his life. Dr. Basu ,thus,encourages us to embrace the spirit of Love which , according to him, is the only way to tide over our pains, sufferings and disillusionment.

Beautifully bound, with a significant photograph on the cover page that exudes peace and harmony the book is well produced( with few typographical errors).The language of the book is lucid and it is interestingly interspersed with rare pictures and important documents.Mr. Amarendranath Basu has done a great service to the mankind by providing a very useful book  for the common mass and research scholars alike.

 

Dr.Madhumita Chanda
Assistant Professor
Department of Humanities
Heritage Institute of Technology
Kolkata

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

আগুনমুখার মেয়ে

আগুনমুখার মেয়ে
নূরজাহান বোস
সাহিত্য প্রকাশ।।  ঢাকা।।  ফেব্রুয়ারী, ২০০৯
তৃতীয় মুদ্রণ, এপ্রিল ২০১১, পৃষ্ঠা ৩০৭

৪০০টাকা।।   

 

নূরজাহান বোসের(১৯৩৮-) ‘আগুন্মুখার মেয়ে’ ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ২০০৯; এপ্রিল ২০১১ এর তৃতীয় মুদ্রণ গ্রন্থ সমালোচনার জন্য ব্যবহৃত। বইটির প্রকাশক মফিদুল হক, প্রচ্ছদ অশোক কর্মকার, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩০৭, মূল্য চার’শ টাকা। নূরজাহান বইটি উৎসর্গ করেছেন মা জোহরা বেগম ও মাসিমা মনোরমা বসুকে। জীবনকথন ঋদ্ধ এই রচনা আত্মবিভোরতা, আত্মসর্বস্বতা মুক্ত। বহুব্যাপ্ত জীবনপথে দেশবিদেশের যে সমস্ত নারীপুরুষের যাপন সংবেদন জাগিয়েছে তাঁদের কাহিনি শুনিয়েছেন আন্তরিক সৌহার্দ্যে। এমনকি ফিল্ড ওয়ার্কের কেস স্টাডিও বর্ণনা করেছেন পরম যত্নে। এক জীবনসূত্রেই উঠে এসেছে বহুবর্ণিল মানবজীবন।                

সাত নদীর মোহনা আগুনমুখা– গলাচিপা, খেপুপাড়া, আমতলি, চরকাজল এবং আগুনমুখার মানুষ ভয়াল ভয়ংকর ঢেউ সামলে পাড়ি দিত অন্যপারে; যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিনতার হরেক সম্ভাবনার সম্ভার। প্রবল ঢেউয়ের উপর সূর্যপাতের লেলিহান শিখা যেমন আগুনমুখার নাম সার্থক করেছে, তেমনি চারপাশের বিরুদ্ধ পরিবেশ ও বিকারগ্রস্ত মানুষদের দঙ্গলে আত্মরক্ষার জন্য অগ্নিবর্ষী বাক্যবাণ ও খরতর মেজাজে ভর করে আগুনমুখার মেয়ে পরিচয়ে নূরজাহান শুনিয়েছেন তাঁর উথাল্-পাথাল সংগ্রামময় জীবনকথা। সেই জীবন জুড়ে আছেন মা জোহরা বেগম; যাঁকে জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখেছেন অসুখী। বড়ো হয়ে যেমন করে হোক মায়ের দুঃখ দূর করার সংকল্প নিয়েছিলেন তিনি বালিকাবয়সে। মায়ের ‘পাগলামি’র জন্যই নূরজাহান গ্রামের স্কুলে চার ক্লাশ অবধি পড়ে হাইস্কুলের পাঠ নিতে পরিজনগৃহে বসবাসের সময় নানা প্রতিকূলতায় স্মরণ রেখেছেন মায়ের উপদেশ- ‘আমি তোমাকে সারাজীবন পাহারা দিয়ে রক্ষা করবো না। নিজেকে রক্ষা করতে হবে তোমাকেই।’ এই কথার সত্যতা উপলব্ধি করলেন দাদামশাই বাড়ির অল্পবয়সী কাজের মেয়ে হামেলাকে বিয়ে করায়। হামেলার করূণ দশা দেখে তাঁর মনে হতে থাকে-‘যে-কোনো সময় আমার এবং আমার মার জীবনেরও একই পরিণতি হতে পারে।’ অচিরেই পুরুষের লোভী হাত ধেয়ে এল তাঁর দিকেও। সেই থেকেই বিদ্রোহ বর্মে অভ্যস্ত হলেন। শিক্ষার পথ কখনোই মসৃণ ছিল না নূরজাহানের- পঞ্চাশে বরিশালে দাঙ্গ লাগলে মাঝপথে পড়া বন্ধ হয়ে যায়। দাঙ্গা থেমে যাওয়ার পর পটুয়াখালিতে পড়তে গিয়ে খালেক চাচার কাছে মার্কসবাদে দীক্ষিত হলেন; তাঁর দুই স্বামীও ছিলেন মার্ক্সবাদী দলের সার্বক্ষণিক কর্মী। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে স্কুলছাত্রী নূরজাহান ধর্মঘটের পক্ষে সহপাঠীদের নিয়ে মিছিলে হেঁটে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ম্যাট্রিক পাশের পর প্রথম বিয়ে, অকাল বৈধব্য ও সন্তানের জন্মদান তাঁকে বিপর্যস্ত করে। অদম্য মনোবলে স্কুল সুপারের চাকরিতে যোগ দেন। এইসময় ছেলে জসিম মরণাপন্ন হলে প্রথম স্বামী ইমাদউল্লাহের ঘনিষ্ট বন্ধু স্বদেশ বোস সহমর্মীতায় নূরজাহানের পাশে দাঁড়ান।

সর্পিল জীবনপথে বহু বাধাবিপত্তি, দাঙ্গাহাঙ্গামা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি প্রাণনাশের হুমকিতেও নূরজাহান মাথা নোয়ান নি। ১৯৬৩ তে স্বদেশকে বিয়ে করেন, ফোর্ড ফাউন্ডেশনের স্কলারশিপ পেয়ে স্বদেশ পিএইচডির সুযোগ পেয়েছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিয়ের পর ছেলে জসিমকে নিয়ে তাঁরা চলে যান কেমব্রিজে। তাঁদের দুই কন্যার জন্ম ওখানেই। ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে ঢাকায় থিতু হতে না হতে মুক্তিযুদ্ধের দামামায় কোলকাতায় যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে থাকাকালীন স্বদেশ মুক্তিযুদ্ধের প্ল্যানিং কমিশনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নূওজাহান সল্টলেক, বারাসাত ক্যাম্পে কাউন্সেলিং করে শরণার্থীদের মনোবল জোগান। চাঁদা তুলে, পুরনো জামাকাপড় সংগ্রহ ক’রে  পৌঁছে দেন মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে দুবছর কাটিয়ে আবার তাঁরা ওয়াশিংটনে যান স্বদেশের বিশ্বব্যাঙ্কের চাকরি সুবাদে। নূরজাহান সোশ্যাল ওয়ার্কে এম এ পাশ ক’রে ওদেশের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যোগ দেন। নিজেও বন্ধু রানু বসুকে নিয়ে সংহতি ও আশা নামে দুটি অলাভজনক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মেয়েদের, মায়েদের জীবনে আশার আলো জ্বালানোয় প্রয়াসী হন। রচনার বিস্তৃত পরিসরে জীবনে জীবন যোগ করার বৃহৎ পরিপার্শ্ব, দেশবিদেশের বিচিত্র অভিজ্ঞতার বুনন মনে করায় প্রসারণই জীবনধর্ম। নূরজাহান সেই ধর্ম পালন করেছেন মেরুদন্ড সোজা রেখে।

 

ড. নিবেদিতা চক্রবর্ত্তী (দত্ত)
এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ
মুড়াগাছা গভর্মেন্ট কলেজ, নদিয়া

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

সেকালের কথা

সেকালের কথা
আশালতা সেন

 

নারী অধ্যয়ন গ্রন্থমালা সিরিজে আশালতা সেনের(১৮৯৪-১৯৮৬) ‘সেকালের কথা’ নামক ক্ষুদ্রায়তন আত্মজীবিনীমূলক গ্রন্থটির প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর একদশক পর মাঘ ১৪০২, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬। সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত এগ্রন্থের  প্রকাশক মফিদুল হক, মূল্য একশত টাকা। বইটির ভূমিকা লিখেছেন রবীন্দ্রস্নেহধন্য রাণী চন্দ। গান্ধীজীর অহিংস সত্যাগ্রহের একনিষ্ঠ সৈনিক, সুসাহিত্যিক ও সমজকর্মী আশালতা নারীর আত্মশক্তি উদবোধনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আশালতা দাশগুপ্তের জন্ম ১৮৯৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালিতে। বাবা বগলামোহন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পাশ করার পর নোয়াখালিতে ওকালতি পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। মা মনোদা দেবী গতশতকের মহিলাদের জীবনযাত্রা নিয়ে বাংলায় ‘গৃহবধূর ডায়েরী’ লিখেছিলেন। বাবা মার প্রত্যক্ষ প্রেরণায় আশালতার শৈশবেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী তাঁর একটি কবিতা সুহৃদ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে অমৃতবাজার পত্রিকা ও বেঙ্গলী পত্রিকায় প্রশংসিত হয়। সাড়ে এগারো বছর বয়সে নোয়াখালি থেকে আশালতার প্রথম কবিতার বই ‘উচ্ছ্বাস’ প্রকাশ পায়। এইসময়ে মাতামহী নবশশীর কাছে স্বদেশীমন্ত্রে দীক্ষিত হন। তিনি তাঁকে পাড়ার গৃহবধূদের কাছে বিদেশী বর্জন ও স্বদেশী ব্যবহারের প্রতিজ্ঞাপত্রে সই সংগ্রহের জন্য পাঠাতেন।  মাত্র বারো বছর বয়সে শিবনাথ শাস্ত্রীর গুণগ্রাহী ও স্ত্রীশিক্ষার অনুরাগী রাজকুমার সেনের বড়োছেলে সত্যরঞ্জনের সঙ্গে আশালতার বিয়ে হয়। বিয়ের দুবছর পর স্বামীর সঙ্গে শিলঙে গিয়ে সুখে ঘরকন্না করেন। ১৯১৬ সালে পুত্র সমররঞ্জনের জন্মের পাঁচমাস পরেই তাঁর স্বামী অকালে প্রয়াত হন। বৈধব্যযন্ত্রণা ভুলতে তিনি লেখালেখি নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। বাংলায় ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল’ ও ইংরাজিতে ‘সাবিত্রী’র আখ্যান রচনা করেন। তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘উৎস’ প্রকাশিত হয়। ক্রমে রাজনীতি ও সমাজকর্মে যুক্ত হয়ে পড়েন। খদ্দরের কাজ শিখে ঢাকায় নিজের বাড়িতে ‘শিল্পাশ্রম’ গড়ে তুলে মেয়েদের স্বনির্ভর করার কাজে যুক্ত হন। ১৯২২ সালে কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পর সুশীলা সেন, গিরিবালা দেবী, সরমা গুপ্ত ও সরযু গুপ্তের সঙ্গে মিলিতভাবে ‘গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি’ গঠন করেন। সমিতির উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের মধ্যে দেশপ্রেমের জাগরণ তথা গান্ধীজ়ীর বাণী ও কর্মপন্থার প্রচার। ১৯২৫ সালে গান্ধীজ়ির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের পর আন্দোলনের জন্য মহিলা কর্মীবাহিনী গঠনের লক্ষ্যে ‘কল্যাণ কুটির’ নামে আর একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। লবন আইন অমান্য করেন নোয়াখালির সমুদ্রতটে সত্যাগ্রহী সেবিকা দলের সঙ্গে। ১৯৩২ এর ৬ মার্চ নবাবগঞ্জে সত্যাগ্রহের নেতৃত্ব দান ক’রে গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৩ এর সেপ্টেম্বরে কারামুক্তির পর তিনি ঢাকা জেলা কংগ্রেস কমিটির সহ সভাপতি নির্বাচিত হন। ‘বিদ্যুৎ’ নামে তৃতীয় কবিতার বই প্রকাশিত হওয়ার কয়েকদিন পরেই পুলিশ সমস্ত বই বাজেয়াপ্ত করে। 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সময় আবার কারারুদ্ধ হন। জেল থেকে বেরিয়ে ’৪৩ এর মন্বন্তরে অর্ধাহারী ও অনাহারী মানুষদের মধ্যে খাদ্য বিতরণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

আশালতার পুত্র সমর ১৯৪৬ সালে বিলেতে পড়তে যায়। সেই বছরেই নোয়াখালিতে দাঙ্গা বাঁধলে গান্ধীজির ডাকে নোয়াখালি গিয়ে সম্প্রীতির কাজে যুক্ত হন। আশালতা বঙ্গীয় আইনসভার সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশভাগ আশালতাকে ভীষণ ব্যথিত করে। গান্ধীজীর আকস্মিক মৃত্যুও তাঁকে শোকগ্রস্ত করে তোলে। সমর ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল আবহে সরকার বিরোধী অবস্থানের জন্য সমরকে ঢাকা ত্যাগে বাধ্য করা হয়। আশালতা ঢাকায় থেকে সমাজসেবায় আত্মোৎসর্গ করেন। ১৯৬৫তে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে ছেলের কাছে চলে যান। সমর ওয়াশিংটনে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত  নিযুক্ত হলে আশালতা সপরিবারে বিদেশে যান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশে বসেই দেশের জন্য জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর বাংলায় রামায়ণ অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। মাত্র ৪১ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্রায়ন গ্রন্থে আশালতার কর্মময় জীবনের অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণে অতৃপ্তি সত্ত্বেও এই জ়ীবনের সঙ্গে পরিচিতিও পাঠকের পক্ষে শ্লাঘনীয়।

 

ড. নিবেদিতা চক্রবর্ত্তী (দত্ত)
এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ
মুড়াগাছা সরকারী মহাবিদ্যালয়, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

Noahkhalir Durjoger Dine

Noahkhalir Durjoger Dine
(An Account of the Aftermath of Riot in Noahkhali in 1946)
Ashoka Gupta
Kolkata: Dey’s Publishing
October 2003, Aashwin 1410
ISBN- 81-295-0169-4
Pages- 86, Hardback

 

It is difficult to straitjacket this slim book into any one category, defying genres Ashoka Gupta’s Noakhalir Durjoger Dine is at once a personal memoir, a Partition history as well as a public document. With an immense sincerity of purpose, the author is able to transcend events meant to be personal ruminations about Mahatma Gandhi and his involvement with Bengal Partition, to a level where she is able to foreground rare glimpses of Gandhi’s mission and strategies as a leader who refused to come to terms with the partition of Bengal and India in 1947.

The title of the book shows the clarity of intention regarding space and time. It is about ‘Noakhali’ ( a district in now Bangladesh) on the eve of partition in 1946 and the tumultuous situation which had developed due to the communal riots. However, as the blurb of the book claims, it is not so much about the graphic details of the destruction of the people and property of Noakhali as much as it is an effort to highlight the concerted activities organised by the members of AIWC (All India Women’s Conference) under the able leadership of Mahatma Gandhi.  For those who have wondered if Gandhiji had anything to do with Bengal and its partition, the book is more than an eye opener through the lens of a young woman saddled with her little child, Kasturi and an immense zest to serve her nation and its women, - we look into a Gandhi who was fond of goat’s milk, fastidious of cleanliness and sanitation, just as he was particular of prayer time and balanced wholesome vegetarian meals.

Gupta often transgresses to reveal the man and his relationship with his spouse- Kasturba. But as the ‘Introduction’ of the book states, the book focuses on Gandhi’s intervention in a part of India (i.e. Bengal) known for its tolerance and communal amity and tries to the trace the  reasons for the sudden disruption on the eve of the holocaust and after the “Great Calcutta Killing” earlier in the same year. While reasons were hard to come by, the author is able to collect together in a very concrete language, the programmes that were undertaken to bring back the people to their homes after being harrowed by the violence. Interspersed throughout, are details of relief and compensatory funds distribution to victimised families in districts of Chowmuhuni, Tumchar and others. It elaborates the roles of women members of AIWC like Sneharani Kanjilal, Sucheta Kripalini, and Nellie Sengupta in getting justice to abducted, raped, wronged women in spite of very adverse conditions like out- break of cholera village after village. In an interesting back and forth technique the narrative links the macrocosm of Freedom Movement at the Pan Indian level to the microcosmic effort of Gandhiji to rehabilitate families affected by riots by procuring employment in cottage industries- to spin khadi cloth. Gupta emphasises Gandhi’s relentless efforts to prevent the Partition even after he had left Noakhali to attend the debated areas of Kolkata.

Noakhalir Durjoger Dine must also be read for the rare postscripts and appendixes- for Gandhi’s views on women and their ability to empower themselves- the portraits of powerful women in later days to come. Readers get to know the forgotten the Sachindranath Mitra, a martyr in Calcutta for the cause of peace between communities. The book goes beyond a  memoir to become an important public document with inclusion of letters, extracts from rare books like RakterAkshare by Kamala Dasgupta and Srinkhal Jhankar by Bina Das which talk about their tryst with the freedom struggle of India

As postscript Gupta includes the then map of Noakhali and a topographical survey of the area with an introduction to the Chittagong district Zilla Women’s Committee and a route map of villages visited by Gandhiji. The volume ends with brief introduction to the figures involved in aiding in the relief work at Noakhali.

In this magical little book which goes much beyond the readers’ expectations, there are better wonders still - the initials pages have photographs- not easy to find- of Gandhi and his aides at Noakhali.

A significant addition in understanding partition in the East and the role of women under the leadership of Gandhi, the book could have had better organisation, barring which, it is an excellent read. Gupta celebrates the spirit underlying the efforts to prevent Partition with an undying optimism and that is what ultimately matters.

 

Dr. Sharmistha Chatterjee (Sriwastav)
Associate Professor and Head
Department of English, Aliah University, Kolkata

 

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

একাত্তরের ডায়েরী

একাত্তরের ডায়েরী
সুফিয়া কামাল

সুফিয়া কামাল রচনা সংগ্রহ
বাংলা একাডেমী ।। ঢাকা ।। বাংলাদেশ

 

সুফিয়া কামালের একাত্তরের ডায়েরী গ্রন্থটি প্রকাশে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন সমাজকর্মে সুফিয়ার অনুব্রতী মালেকা বেগম। ১৯৮৯ সালে মালেকার উদ্যোগে গ্রন্থটির প্রথম আত্মপ্রকাশ। পরবর্তীতে জাগৃতি প্রকাশনী গ্রন্থটি প্রকাশ করে ২১ফেব্রয়ারি,১৯৯৫ সালে, মূল্য ৬০টাকা। ‘একাত্তরের ডায়েরী’ সুফিয়া উৎসর্গ করেছেন– ‘একাত্তরের শহীদদের উদ্দেশে’; সেইসঙ্গে ‘ভূমিকা নয়, রক্তে লেখা শোক’ শিরোনামের এক দীর্ঘ রচনায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাত তুলে ধরেছেন অদ্ভুত সাবলীল ভাষায়। পড়তে পড়তে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সাথে নিবিড় যোগ রচিত হয় পাঠকের। গ্রন্থ-সমালোচনাটি সুফিয়া কামালের কনিষ্ঠপুত্র সাজেদ কামালের সম্পাদনায় ঢাকা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সুফিয়া কামাল রচনাসংগ্রহ এর ৫৯৫-৬৫০ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত রচনা থেকে সংগৃহীত। সুফিয়া কামালের তিরোভাবের পর আষাঢ় ১৪০৯(জুন ২০০২)এই রচনাসংগ্রহের আত্মপ্রকাশ।    

বরিশালের শায়েস্তাবাদ নওয়াব পরিবারের দৌহিত্রী সুফিয়া কামাল(১৯১১-১৯৯৯)কবি ও সমাজকর্মী পরিচয়ে কাজ করেছেন দুই বাংলাতেই। দেশভাগের পর পাকাপাকিভাবে থিতু হন ঢাকায়।  পশ্চিম-পাকিস্তানের আগ্রাসন ও নারকীয়তার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ তীব্রতর হয় বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে। ঢাকায় মেয়েদের সংগঠিত মিছিলে সুফিয়া নেতৃত্ব দেন শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। প্রতিবাদী সুফিয়ার শাসকবিরোধী অবস্থান তীব্র আকার নেয় ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়। বুদ্ধিজীবীদের খতম তালিকায় নাম আছে জেনেও তিনি দেশের মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকেছেন। খালাম্মা সুফিয়ার নিরাপত্তায় মুক্তিযোদ্ধারা ছিল অতন্দ্র। পাকবাহিনীর সীমাহীন অত্যাচার ও রক্তপায়ী হিংস্ররূপের পরিচয় মুদ্রিত আছে ‘একাত্তরের ডায়েরী’তে।    

ডায়েরী–রোজনামচা–দিনলিপি একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রাসঙ্গিকী। ব্যক্তিজীবনের গোপন সুখদুঃখ, জ্বালাযন্ত্রণা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিবরণীনির্ভর রচনাক্রমে সুফিয়া কখনও আত্মজনের নিরাপত্তাহীনতায় কাতর হয়েছেন, কখনও দেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আশঙ্কার প্রহর গুনেছেন। এ যেন দিনলিপিকরের দ্বৈত ভূমিকায় অবতরণ– পারিবারিক সুফিয়া ও দেশপ্রাণ সুফিয়ার অনুক্ষণের উৎকন্ঠাময় যাপনকালের বিবরণ। মস্কো যাওয়ার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে বলেছেন – “এখন আমি এ দেশ ছেড়ে বেহেশতেও যেতে রাজী নই। আমার দেশ, আমার দেশের মানুষেরা শান্তি পাক, সোয়াস্তি লাভ করুক- এ দেখে যেন আমি এই মাটিতেই শুয়ে থাকতে পারি।’’ ষাট বছরের প্রান্তছোঁয়া কবিকন্ঠে সংকল্পের দৃঢতা ও আত্মবিশ্বাস বিস্ময়কর। উনিশশো সত্তরের ৩০ ডিসেম্বর ডায়েরির চলন শুরু, সমাপ্তি একাত্তরের ৩১ ডিসেম্বর। ওই বছরেই ১২ই নভেম্বর শতাব্দীর প্রচন্ডতম ঝড় আছড়ে পড়েছিল বাংলাদেশের বুকে। প্রৌঢ়া কবি পরিবার পরিজন পিছনে ফেলে ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণ করেন। গৃহহীন, অন্নহীন, ত্রাণহীন, রোগজর্জর মানুষজনের পাশে দাঁড়িয়ে ধানখালির চর, চরবিশ্বাস, চরসাগস্তি, পটুয়াখালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ত্রাণ বিলি করে দেশে ফিরলেন, দেশের পরিস্থিতি তখন অগ্নিগর্ভ। তারপর ধীরে ধীরে মুক্তিকামী মানুষ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে, মুক্তির সংগ্রামে নামে। মুক্তিযুদ্ধের ন’মাস  সুফিয়া ধানমন্ডীর বাড়ির বারান্দায় বসে পাক মিলিটারির পদচারণা শুনেছেন, আর কাঁথা সেলাই করেছেন ন’মাসে ন’টি। দেখেছেন দলে দলে মানুষ দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিচ্ছে প্রতিবেশী দেশে। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় পড়শীরা তাঁর কাছে তাঁদের রেশন কার্ডগুলি রেখে গিয়েছিলেন। সেই কার্ডে তিনি রেশন তুলে রাখতেন, রাতের অন্ধকারে মুক্তিযোদ্ধারা সেই রেশন নিয়ে যেত বস্তায় ভরে। একাত্তরের মাঝামাঝি মেয়েদের উপর খানসেনাদের নারকীয় অত্যাচার শুরু হলে নিজের দুই কন্যাকে আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পাঠান সেবাকার্যের জন্য আর নিজে ছুটে যান ঢাকার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে মেহেরুন্নিসার মত নিষ্পাপ মেয়েদের সম্ভ্রম বাঁচাতে। তাঁর বড়জামাই আব্দুল কাহহার নিহত হলে ব্যথাহত হৃদয়ে লেখেন- ‘আমার দুলুর মুখ দেখি বাংলার ঘরে ঘরে’। বদলে যেতে থাকে দেশ  ও জাতির ইতিহাস।  নতুন চরে জেগে ওঠে নতুন দেশ, নতুন ভাষা, সে ভাষা বাংলা ভাষা। আবেগের সে ভাষায় ঐতিহাসিক বিজয় গাথার স্মারক মুহূর্তকে শব্দবন্ধের গ্রন্থনায় সংকলিত করেছেন সুফিয়া হৃদয়ানুভূতিতে রসসিক্ত করে। সুফিয়া কামালের ‘একাত্তরের ডায়েরী’ বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি পর্বখন্ডের অসামান্য দলিল।  

 

ড. নিবেদিতা চক্রবর্ত্তী (দত্ত)
এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ
মুড়াগাছা গভর্মেন্ট কলেজ, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

একালে আমাদের কাল

একালে আমাদের কাল
সুফিয়া কামাল

সুফিয়া কামাল রচনা সংগ্রহ (প্রথমখণ্ড)
বাংলা একাদেমী।। ঢাকা।। বাংলাদেশ

 

সাতাত্তর বছর বয়সে কবি-সাহিত্যিক ও সঙ্গীতকার আবু সিকান্দার জাফরের দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়ে সুফিয়া কামাল(১৯১১-১৯৯৯) ফেলে আসা দিনের কথা একালে আমাদের কাল  রচনায় মেলে ধরেছেন। ২০ জুন ১৯৮৮, ঢাকার ‘জ্ঞান প্রকাশনী’ একালে আমাদের কাল  প্রকাশের মাধ্যমে প্রকাশনা জগতে যাত্রা শুরু করে। গ্রন্থটির ব্যবস্থাপক বাংলা একাডেমী প্রেস, ঢাকা। শোভন সংস্করণের মূল্য মুদ্রিত আছে ২২ টাকা, সুলভ সংস্করণ ১৮ টাকা, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮+৫৬। গ্রন্থ-সমালোচনাটি সুফিয়া কামাল রচনাসংগ্রহে (১ম খন্ড) ৫৫৭-৫৯৪ পৃষ্ঠা থেকে গৃহীত। একালে আমাদের কালে  সুফিয়া  হারানো জীবনের ছড়ানো-ছিটানো কথা কণা কণা সংগ্রহ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিগত সময়কে ও সেইসব হারানো মানুষদের; সেই সঙ্গে অবিভক্ত বাংলা ও পরবর্তী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ্ মুহূর্তের উত্তাল সংগ্রামমুখর সময়ের চলচ্ছবি স্মৃতিপটে এঁকেছেন।

 

সুফিয়ার জন্ম পৃথিবীর এক আশ্চর্য রূপান্তরের কালে — প্রথম মহাযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলিম রেনেসাঁর কাল, রাশিয়ার বিপ্লব, বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার, সাহিত্য-সংস্কৃতির নবধারায় স্নাত তাঁর ব্যক্তিজীবন। অবিভক্ত বঙ্গের বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদের রাহাত মঞ্জিল প্রাসাদের মাতুলালয়ে জন্মেছিলেন সুফিয়া। শায়েস্তাবাদ পরগণার উদ্ভবের মূলে রয়েছেন ইতিহাসপুরুষ শায়েস্তা খাঁ। সুফিয়ার নানা নওয়াব মোয়াজ্জেম হোসেনের পূর্বপুরুষের সঙ্গে শায়েস্তা খাঁয়ের কন্যা পরীবানুর বিবাহ হলে কন্যার ‘পানদান’ স্বরূপ শায়েস্তা খাঁ এই পরগণা যৌতুক দেন। পরীবানুর সন্তান-সন্ততিরা ছিলেন শায়েস্তাবাদ পরগণার আদি বাসিন্দা। সুফিয়ার মা সাবেরা খাতুন নওয়াব পরিবারের কন্যা; বাবা আব্দুল বারি  দরবেশ হয়ে দেশান্তরী হন সুফিয়ার সাতমাস বয়সে। রাহাত মঞ্জিল প্রাসাদের রক্ষণশীল ঘেরাটোপে কাটে তাঁর শৈশব-কৈশোরের দিনগুলি। পারিবারিক জুবিলি স্কুলে প্যারিলাল মাস্টারমশাইয়ের কাছে কিছুদিন পায়জামা, কুর্তা, আচকান পরে ছেলের প্রক্সি দিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। পারিবারিক ভাষা উর্দু হলেও তিনি বাংলা লিখতে পড়তে শিখেছিলেন মায়ের কাছে। মায়ের উৎসাহে সুফিয়া বড়মামার বিরাট লাইব্রেরিতে চুরি করে খাটের তলায় লুকিয়ে বই পড়া শুরু করেন। আর এভাবে বই পড়তে পড়তে টুকটাক লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। বারো বছর বয়সে মামাত দাদা নেহাল হোসেনের সংগে বিয়ের পর তিনি চলে আসেন বরিশালে; তাঁর প্রথম রচনা ‘সৈনিক বধূ’ প্রকাশিত হয় বরিশালের ‘তরুণ’ পত্রিকায়। ধীরে ধীরে লেখালেখির সূত্রে তাঁর পরিচয়ের বলয় বাড়তে থাকে– অশ্বিনীকুমার দত্তের ভ্রাতুষ্পুত্রবধূ সাবিত্রী দত্তের মাতৃমঙ্গল ও শিশুসদন সমিতির কাজে যোগ দেন। কালাবদরের গ্রাসে রাহাত মঞ্জিল প্রাসাদ  তলিয়ে গেলে চরভাঙ্গা, ঘরভাঙ্গা হয়ে তাঁরা আসেন কলিকাতায় এবং সওগাত পত্রিকায় লেখার সূত্রে কবিপরিচয়ে খ্যাত হন। অন্যদিকে বেগম রোকেয়ার সান্নিধ্যে সমাজকর্মেও ব্রতী হন। ১৯৩২ সালে নেহাল হোসেনের মৃত্যুর পর আশ্রয়হীন, বিত্তহীন সুফিয়া শিশুসন্তান ও মাকে নিয়ে কোলকাতা কর্পোরেশনের সামান্য মাইনের চাকরি সম্বল করে দিন কাটিয়েছেন। ১৯৩৮ এ অসুস্থ সুফিয়ার সঙ্গে কামালউদ্দিন সাহেবের বিয়ে  হয়; উদার সহমর্মী স্বামীর সংস্পর্শে নতুন উদ্যমে সাহিত্যকর্মে, স্বদেশব্রতে ও সমাজকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। দেশভাগের পর সুফিয়া ঢাকায় স্থিত হয়ে লীলা রায়ের শান্তি কমিটির সঙ্গে  হাত মিলিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ক্রমে নারীমুক্তি ও নারীস্বাধীনতার লক্ষ্যে মহিলা পরিষদ  ও মহিলা সমিতির পাশাপাশি কচিকাঁচার মেলা, ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিজড়িত সুফিয়া নিজেই হয়ে ওঠেন একটি প্রতিষ্ঠান।

জীবনসংগ্রাম ও বহুমুখী কর্মসাধনার খন্ডচিত্র একালে আমাদের কাল বিন্দুতে সিন্ধুর প্রতিভাস।  জীবনেতিহাসের বিস্তৃতিতে অনুপুঙ্ক্ষ এই বয়ান; নির্ভার এই কথনে কোথাও অযথা কালক্ষেপ করেননি সুফিয়া। বরং যে পরিমন্ডলে তাঁর জীবনপথের যাত্রারম্ভ, যাঁরা প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে তাঁর পরিক্রমণ পথে এসেছেন উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণার ডালি সাজিয়ে; তাঁদের কথা বলেছেন আবেগপূর্ণ ভাষায়। ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়ঝঞ্ঝা, দুঃখ শোক গ্লানির বর্ণনায় পাঠককে ভারাক্রান্ত না করে স্বল্পকথায় ঘটনাক্রমকে ছুঁয়ে গেছেন মাত্র। রবীন্দ্র-নজরুল-কামিনী রায়-রোকেয়া-লীলা নাগের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে সাহিত্যকর্ম তথা সমাজকর্মে অবতীর্ণ সুফিয়ার বহুমুখী বিকাশ পাঠককে মনে করায় ‘নারী তুমি অর্ধেক আকাশ’।

 

ড. নিবেদিতা চক্রবর্ত্তী (দত্ত)
এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ
মুড়াগাছা গভর্মেন্ট কলেজ, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

শেষ পারানির কড়ি

শেষ পারানির কড়ি
দীপ প্রকাশন।।কলকাতা।
প্রথম প্রকাশ: মে,২০১৬।
দাম ১২০ টাকা। প্রচ্ছদ অভিজিৎ পাল। পৃষ্ঠা ১০২

 

ইতিহাসের স্মৃতি ভবিষ্যৎ কালে  নির্দয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য মানবিক সততা মূল অবলম্বন। সেই সত্য থেকে সরে আসাই বিপর্যয়। লেখক দেশবিভাগ-এর প্রত্যক্ষদর্শী ফলে কতগুলি গ্রন্থ- মৌলানা আবুল কালাম আজাদ-এর ‘India wins Freedom’; খান আব্দুল গফফার খান-এর ‘Thrown to the Wolves’, রামমনোহর লোহিয়ার- ‘Guliltymen of India’s Partition’, চৌধুরী খালিকুজ্জামানের-‘Pathway to Pakistan’, Larry Collins এবং Dominique Lapierre-এর ‘Freedom at Midnight’, D.G. Tendulkar-এর ‘Khan Abdul Gaffar Khan’ লেখকের মনে প্রশ্ন জাগায়-‘ দেশবিভাগ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির লেখা সম্পর্কে পুনর্বিচারের প্রয়োজন আছে।’ প্যারেলাল-এর ‘Gandhi the Last Phase’(VOL-I&II), এবং নির্মল কুমার বসু-র ‘My days with Gandhi’ এই দুটি গ্রন্থকে লেখক জবাবী গ্রন্থ স্বরূপ উপস্থিত করেছেন।

বইটিতে অধ্যায় বিভাজন নেই; তথ্যভিত্তিক স্মৃতিচারণামূলক রচনা। ১০২ পৃষ্ঠার বই। সাংবাদিক সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবিসহ বইটিতে ইতিহাসের মধ্যে আর এক অন্য ইতিহাসকে তুলে এনেছেন। তার মোদ্দা বিষয় হ'ল দেশভাগ এবং বাংলাভাগ।

মাউন্টব্যাটেন মনে করতেন দেশভাগ দুজন মানুষ চান না। একজন মহাত্মা গান্ধী অন্য জন মাউন্টব্যাটেন! মাউন্টব্যাটেন বুঝি প্রাচীন ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্র চর্চা করতেন, তাই এই আইরনি! নির্মলকুমার বসু ‘My Days With Gandhi’গ্রন্থে নোয়াখালীর ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টরা যে রিপোর্ট প্রদান করেছিলেন তা ছিল ভয়াবহ। সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত সেই রিপোর্টটি এই বইতে  প্রকাশ করেছেন। ১৯৪৭ সালের অগাস্ট মাসে লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, ও গুরজানওয়ালার নারকীয় হিংসার ঘটনা থেকে আসা টেলিগ্রামগুলি প্যারেলাল- ‘Gandhi the Last Phase’, গ্রন্থের লিপিবদ্ধ আছে, চিন্তান্বিত মাউন্টব্যাটেন পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশের জন্য  joint Boundary Force গঠন করে ছিলেন; এই সময় মুম্বাই-এর এক সাংবাদিক ডি এফ কারকা ওই সৈন্যদের পোশাক পরে তাদের গাড়িতে উঠে পড়েন এবং লাহোরের রাস্তায় যে দৃশ্যটি তাকে স্তম্ভিত করে দিলো- কয়েক ডজন নগ্ন ও রক্তাক্ত মহিলা সারিবদ্ধভাবে পিছনে হাত বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রত্যেকের পিঠে কাগজে লেখা তাঁরা কতবার ধর্ষিত তার বিবরণ। ‘the Current’ পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছে বলে তথ্য প্রদান করে -‘Freedom at Midnight’, এই তথ্য জানার পরেই গান্ধী লাহোরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ । পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলী এই যাত্রা বন্ধের আবেদন করেন। কেন? মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদরা ছিলেন দেশভাগের কুশীলব। এঁদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনীতি , সাধারণ মানুষ নয়। ‘India wins Freedom’-এর প্রকাশক হুমায়ুন কবির। যিনি বেশ কিছু অংশ মার্কিং করে নেহেরুকে বলেছিলেন কোন কোন অংশ বাদ দিতে হবে! এই সত্যি ঘটনার কোন ব্যাখ্যাও নেই! পৃথিবীর কেউ তা জানেও না! পরবর্তী কালে দ্বিতীয় সংস্করণেও অসত্য ভাষণের শুদ্ধ সংস্করণ পাওয়া গেলে। ফলে ‘Pathway to Pakistan’, বইতে আজাদ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহেরু, এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদরা কোন সত্যকে গুরুত্ব দিলেন?  দেশভাগের আগে ৬লক্ষ মানুষ খুন! ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ পিতৃপুরুষের ভিটে থেকে বিতাড়িত– ১ লক্ষ তরুণী তাদের কেউ কেউ ধর্মান্তরিত-কেউ বা পণ্য হিসেবে বিক্রিত, ৬০ হাজার নারী ধর্ষিতা তাঁর মধ্যে ৬ হাজার বিকলাঙ্গ। এই আমাদের স্বাধীনতা।  

দেশবিভাগের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রদেশ দুই দেশ থেকে আলাদা কিম্বা যেকোনো দেশের সঙ্গে থাকতে পারে। এই যুক্তিতেই ‘সার্বভৌম বঙ্গ’(Independent Sovereign Bengal) আন্দোলনের উদ্ভব। ১৯৪৭ সালের জুন মাসে শরৎচন্দ্র বসু এবং শাহিদ সুরাবর্দি ‘সার্বভৌম বঙ্গ’ ভাবনা নিয়ে গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করেন, বাপুজি শরৎচন্দ্র বসুর এই ভাবনাকে ‘বিবেচনার যোগ্য’ বলে মনে করেন। বাপুজি বেলেঘাটা থাকাকালীন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর কাছে উপস্তিত হলেন। তিনি গান্ধীর কাছে একটাই প্রশ্ন রাখলেন ‘সুরাবর্দি যদি তাঁর প্রস্তাবের সঙ্গে এই কথাটি লিখে দেয় যে- ‘Independent Sovereign Bengal shall never acceded to Pakistan’ তাহলে আমি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ওই প্রস্তাবে রাজি আছি। বাপুজি সুরাবর্দিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে সুরাবর্দি লাফিয়ে ওঠেন এবং প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করেন। ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা’ গঠনের প্রস্তাব সেদিনই সমাধিস্থ হয়। এই ভূত ভবিষ্যতই ভারতবাসী বাঙালির পারের কড়ি। এই গ্রন্থের বড় ত্রুটি পুনরুক্তি।

 

ড উত্তমকুমার বিশ্বাস
বাংলা বিভাগ, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়
কলকাতা

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

সুপুরিবনের সারি

সুপুরিবনের সারি
শঙ্খ ঘোষ

 

‘সুপুরি বনের সারি’ শঙ্খ ঘোষের জীবনস্মৃতিতে দেশভাগ নিয়ে একটি সাড়া জাগানো উপন্যাস। ১৯৯০ বাংলার ১৩৯৭ সালে অরুণা প্রকাশনী থেকে এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বিভাজনের রাজনীতি, দাঙ্গার রক্তাক্ত ইতিহাসের সরাসরি বিবরণ না থাকলেও স্মৃতিতাড়িত মানুষের সুপুরি বন খুঁজে ফেরার পরিমাপ বোঝা যায়, বইটির মুদ্রণ দেখে। ১৪১৯ পর্যন্ত বইটি একাধিকবার মুদ্রিত হয়। বইটির বর্তমান মূল্য ষাট টাকা। ছোট্ট আত্মদীপের উদ্দেশ্যে বইটি উৎসর্গিত।

সাহিত্যিক শঙ্খ ঘোষের আলাদা করে পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। বিশিষ্ট কবি, সাহিত্য সমালোচক ও রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ। তাঁর ‘সুপুরি বনের সারি’ এক উল্লেখযোগ্য কিশোর উপন্যাস। বইটি ঔপন্যাসিক শঙ্খ ঘোষের লেখা ‘সকাল বেলার আলো’(১৯৭২) র পরবর্তী অংশ। এরপর ১৪১৬ তে লেখা হয় ‘সুপুরি বনের সারি’র পরবর্তী অংশ ‘শহরপথের ধুলো’। সহজেই বই তিনটিকে ‘ট্রিলজি’ বলা যায়।     

শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ সালে চাঁদপুরে মামারবাড়িতে। পৈত্রিক বাড়ি বরিশালে। ১৯৪৭ এর দেশভাগ মানুষটিকে পরিবারসহ দেশচ্যুত করেছিল। ‘সুপুরি বনের সারি’ রচনায় যার প্রভাব স্পষ্ট। শঙ্খ ঘোষের ‘সুপুরি বনের সারি’ কিশোর উপন্যাস হিসাবেই পরিচিত, যার পূর্ববর্তী অংশের কথা পাওয়া যায় ‘সকাল বেলার আলো’ রচনার মধ্যে। উপন্যাসটিতে বড় করে তোলা হয়েছে কিশোর  নীলুর মামাবাড়ি যাওয়ার কাহিনিকে কেন্দ্র করে। দেশভাগ নীলু বোঝেনা, কিন্তু কোথাও হঠাৎ করে বদলে যাওয়া, সামাজিক পরিবর্তনের চিহ্ন তার ভেতরে প্রশ্ন তৈরী করে। একটা সময় নীলুর বাড়ি আর মামাবাড়ি একই দেশে ছিল অথচ দেশভাগের ফলে সেই দেশ নীলুর কাছে পর হয়ে যায়। নীলু সেভাবে দেশভাগের ব্যথা বোঝেনি, সহ্য করেনি কোনও রকমের অত্যাচারও। কিন্তু নীলুর ছোট্ট হৃদয় উপলব্ধি করেছে মামাবাড়ির  দেশবদলের যন্ত্রনাকে। এই ট্রমা কিভাবে দেশভাগের কিশোর প্রজন্মের মননকে নাড়া দিয়েছে , নীলুই তার প্রমাণ।

সাহিত্যিক উপন্যাসটিকে বারোটি পরিচ্ছেদে ভাগ করেছেন। এখানে কোনও পরিচ্ছেদের আলাদা করে কোনও নামকরণ করা হয়নি ঠিকই কিন্তু প্রত্যেকটি পরিচ্ছেদ একে অপরের সঙ্গে বিনি সুতোর মালায় গাঁথা। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে পদ্মানদীর ওপর দিয়ে পুজোর সময় এক কিশোরের মামাবাড়ি যাওয়ার কাহিনি দিয়ে। সদ্য দেশভাগ হয়েছে তখন তাই মামাবাড়ি যাওয়ার সময় সব যেন অন্য রকম লাগে কিশোরটির চোখে। অন্যবার পুজোয় দল বেঁধে একসঙ্গে যাওয়ার মজাটাও সে আর পায়না। একা হয়ে যায় নীলু। সঙ্গে নেই অন্য ভাই বোনেরা। নীলু শোনে ‘দেশটা না কি এবার ভাগ হয়ে গেছে। নীলুদের গ্রামটা নাকি এখন অন্য দেশ’।  এই সব ‘আজব কথা’র মর্মার্থ বুঝতে পারেনা সে। শুধু উপলব্ধি করে, তারা আর কোনদিন দেশে যেতে পারবেনা।  তবু নীলুরা আশায় বুক বেঁধে থাকে তার বন্ধু হারুনকে অনেকদিন পর দেখতে পাবে বলে। কিন্তু সেই আশাও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় যখন নবমীর দিন পর্যন্ত হারুনকে দেখতে না পেয়ে সে তার বাড়ি যায়। হারুনের মুখ থেকে শোনে ‘এয়্যা তো আর তোগো দ্যাশ না, তোরা তো অ্যাহোন অইন্য দ্যাশের লোক’। যে ট্রমা নিয়ে সে বরিশালে এসেছিল হারুনের কথায় তা নিঃশব্দ ক্রন্দনে পরিণত হয়।কিশোরটির সেই মনোব্যথা ভাষারূপ পায় তার লেখা এক বিশেষ কবিতায়।

‘সুখের দুটি পায়রা এসে বসছে জুড়ে একটি ডাল
আমার সেথা কীই বা অধিকার
জাগাই কেন বৃথাই সেথা মৃত আশার ব্যর্থ তাল
মনোমাঝেই থাক সে হাহাকার’

নীলুর এই মানসিক বোঝাপড়া থেকেই দেশভাগের বিভীষিকাময় রূপ বুঝতে পারা যায়। শুধু এই নয়- পুজোর দিন গুলোতে গোটা বাড়ির নিস্তব্ধতা, অন্যবারের মতো নবমীর দিন নটা ঢাক না এসে একটা ঢাক আসা, নীলুর ফুলমামীর হঠাৎ মানসিক বিকৃতি ইত্যাদি সমস্ত ঘটনাগুলিও একজাতীয় প্রতীক হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়। পাঠক সহজেই আখ্যানের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারে।

সাহিত্যিক শঙ্খ ঘোষ এক অসাধারণ আত্মজৈবনিক ছন্দে উপন্যাসটি গড়ে তুলেছেন। নীলমাধব ওরফে নীলাই চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে পাঠক লেখকেরই প্রতিচ্ছায়া দেখতে পায়। বুঝতে পারে বাস্তুহারা মানুষটি দেশভাগের যন্ত্রনা উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তার লেখায় বাস্তব এতো প্রাণবন্ত রূপ পেয়েছে। শুধু নীলুই নয় আখ্যানের প্রায় প্রতিটি চরিত্রের স্বগতোক্তির মধ্য দিয়ে আমরা সেই সময়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই। আমাদের অস্বিত্বের ভিত সম্পর্কে সচেতন হই। আর তখনই ভালোভাবে বুঝতে পারি তা হারানোর যন্ত্রনাকে। উপন্যাস শেষে তাই বড়োমামা যখন নীলুকে সুপুরি বন দেখিয়ে তাদের গ্রামের শেষ সীমানা বোঝাতে চায় ততক্ষণে বুদ্ধিমান নীলু খুঁজতে থাকে শেষ থেকে নতুন পথে হাঁটার রাস্তাকে।    

 

ড. আত্রেয়ী সিদ্ধান্ত
সহকারী অধ্যাপিকা, বাংলা বিভাগ
ইন্দাস মহাবিদ্যালয় 

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

এপার-ওপার

এপার-ওপার
ব্রজেন মল্লিক
আন্তরিক প্রকাশনী, কলকাতা;  প্রথম প্রকাশ : মহালয়া, ১৪০৫
মূল্য : পঁয়ত্রিশ টাকা

 

দেশভাগ শুধু এক রাজনৈতিক সত্য নয়। দেশভাগ যারা দেখেছে বা যাদের জীবনে ঘটেছে , তাঁরাই জানেন, শিকড় ওপড়ানো গাছের নদীতে ভেসে যাওয়া হল দেশভাগ। আবার আঁকুপাঁকু করে শিকড় চারানোর জন্য মাটির খোঁজ হল দেশভাগ। তাই এই ঘটনা তথাকথিত অনামী লেখককেও প্রাণিত করেছে ছিন্নমূল মানুষের আখ্যান লেখার জন্য । ব্রজেন মল্লিক তেমনই একজন লেখক। লেখকের এর থেকে বেশি পরিচয় তাঁর এই উপন্যাসে আমরা পাই না। তবে তিনি যে এই উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম, তা বোঝা যায় , উপন্যাসটি তিনি উৎসর্গ করেছেন ‘দেশবিভাগের প্লাবনে যে বানভাসি মানুষেরা পাড় আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করেছেন এ বাংলায়’। লেখকের কথাতেই পাই , এই উপন্যাসের প্রাথমিক কাঠামো গড়ন শুরু হয় ওপার বাংলায়, তখন তার নাম ছিল ‘টুকুরি’। উপন্যাসটি দুটি অংশে ছাপা হয়েছে ‘অদল বদল’ মাসিক পত্রিকায় ও তিন সংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ পায় ‘এপার-ওপার’ মাসিক পত্রিকায়। লেখকের অন্যান্য রচনা ‘রক্তে রাঙা রূপসী বাংলা’(১ম ও ২য় খণ্ড) , ছোটগল্প ‘খেংরা’, নাটক ‘যে ফুল না ফুটিতে’, ‘তিন তিন ধরি’, ভ্রমণকাহিনী ‘রূপকথার দেশে’ ইত্যাদি।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র টুকুরি কিশোরীবেলায় বাবা-মার সঙ্গে নিজের ভিটে ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল ইন্ডিয়ায়। কিন্তু শৈশবের পুকুরঘাট, গাবগাছ আর খেতে না পাওয়া ভুতের মতো চেহারার মোংলা তার স্মৃতি ঘিরে আছে। সেই স্মৃতিটুকু সম্বল করে টুকুরি তার বাপ গুরুচরণের হাত ধরে ফিরে আসে তার আপন দেশ, ‘পূর্বপাকিস্তানে’। মা মানোদাকে চিরতরে রেখে আসে ইন্ডিয়ার মাটিতে। রেখে আসে তার জীবনের আরও অনেক ঘটনাবহুল সময়কাল। টালিগঞ্জের রেল কলোনিতে তার সংক্ষিপ্ত বিবাহিত জীবন, জেল খাটা, ওয়াগান ব্রেকার স্বামী বিরাজ, আর পুলিশের গুলিতে থেঁতলে যাওয়া একটা মুখ আর টুকুরির অকাল বৈধব্য।

তের-চোদ্দ বছর পর আপন দেশ পূর্ব-পাকিস্তানে ফিরে গুরুচরণ পেয়েছিল শুধু পোতার জায়গাটুকু। চেনা মানুষগুলোর কারো অনুরাগে, কারো বিরাগে মেয়ে টুকুরিকে নিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধে সে। কিন্তু ভেসে বেড়াবার ধকল, ছিন্নমূল হবার যন্ত্রণা, ভাত-মাটি-কাপড়ের সন্ধান তার শরীরকে দুর্বল করে দেয় । ক’দিনের জ্বরে তার প্রিয় জন্মভিটেতে চোখ বোজে গুরুচরণ। তারপর অসহায় টুকুরি আবার বেরিয়ে পড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। চারপাশের হিংস্র শ্বাপদের থেকে বাঁচতে তার প্রিয় মানুষ মোংলাকে নিয়ে আবার পাড়ি দেয় ইন্ডিয়ার দিকে, সেখানে এখানকার পুলিশ ও  ক্ষমতাবানের হাত পৌঁছোবে না। এইভাবেই পরিচিতির সন্ধানে, আশ্রয়ের সন্ধানে নীড় বাঁধার জন্য দেশভাগের ঝড়ের মুখে কুটোর মতো তারা ভেসে চলে এক দেশ থেকে অন্য দেশে।

 

 

ড অনিন্দিতা দাশগুপ্ত
এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ
গুরুদাস কলেজ, কলকাতা          

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

নোয়াখালির ইতিহাস

নোয়াখালির ইতিহাস
প্যারীমোহন সেন
পৌরব প্রকাশন ।।শ্রীরামকৃষ্ণপল্লী, কলিকাতা ১৫০।। পৃঃ১০৮
পৌরব প্রথম প্রকাশঃ ভাদ্র, ১৪১৭
মূল্য ষাটা টাকা

 

বাঙালির ইতিহাসবোধ নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের আক্ষেপ সর্বজনবিদিত। বাঙালিকে তিনি ইতিহাসবিহীন এক জাতি হিসেবে কঠোর সমালোচনায় বিদ্ধ করে বলেছিলেন—“এমন একজন হতভাগ্য জাতি আছে যে, কীর্ত্তিমন্ত পূর্বপুরুষগণের কীর্ত্তি অবগত নহে। সেই হতভাগ্য জাতিদিগের মধ্যে অগ্রগণ্য বাঙালী”। ১৮৭৪সালের এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে সাড়া ফেলেছিল। অভিভক্ত বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদার ও অধিবাসীদের বিশিষ্ট চারিত্রকে আঞ্চলিক ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রাখার প্রেরণা সেসময় যে কতিপয় বাঙালি অনুভব করেছিলেন শ্রীযুক্ত প্যারীমোহন সেন তাদেরই অগ্রগণ্য। মনে পড়ে সতীশচন্দ্র মিত্রের কথা যিনি ১৯১৪ ও ১৯২২সালে দুই খণ্ডে যশোর-খুলনার ইতিহাস লিখেছিলেন বহু দুর্লভ পান্ডুলিপি ও দলিল সংগ্রহের মাধ্যমে। ১৯০৪সালে তিনি খুলনার দৌলতপুর হিন্দু আকাদেমিতে শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগ দেন। আমৃত্যু ছিলেন সেই স্কুলে। এমন শিক্ষকদের এই উদ্যোগগুলির মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়।

 ১৮৭৬সালে প্যারীমোহন সেন ‘নোয়াখালির ইতিহাস’ শিরোনামে গ্রন্থটি লেখেন; খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এর প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হয়। প্রায় ৬৪ বছর পর ১৯৪০সালে গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের যত্ন নেন গ্রন্থকার। বিলুপ্তপ্রায় সেই গ্রন্থটি পুনরায় পাঠকের সামনে আনার প্রয়াস নিয়েছেন সম্পাদক কমলাক্ষ দাস। সাকুল্যে ১০৮পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের ইতিহাস লিখনরীতি আজ অনেক বদলে গেছে একথা ঠিক, কিন্তু আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার যে ধারা নতুন প্রত্যয়ে তৃতীয় বিশ্বে কলোনির ধ্বংসাবশেষ থেকে মাথা তুলছে সেখানে এমন গ্রন্থ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

 পূর্ববঙ্গের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য তার সমাজ-অর্থনীতির মধ্যেও গভীরভাবে প্রতীয়মান। অধুনা বাংলাদেশের পুনর্গঠিত জেলাভিত্তিক শাসনব্যবস্থার অন্তঃস্থলে ঔপনিবেশিক পর্বের সেই স্থানিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলি আজও বহমান। ‘নোয়াখালির মানুষ’, ‘ঢাকার লোক’, ‘বরিশালের লোক’, ‘সিলেটের লোক’ ইত্যাদি পরিচিতিগুলিকে জনমুখে হামেশাই মানবচরিত্রের চিহ্ণায়ক হয়ে উঠতে দেখা যায়। পূর্ববঙ্গের এই বিশিষ্ট ভৌগোলিক পরিচয় ও কীর্তিমান পুরুষদের, জমিদারতন্ত্রের এমনকী বংশানুক্রমে প্রবহমান সামন্ততান্ত্রিক জীবনচর্যার খবর লোকমুখে গল্পের মত চলে। মহাফেজখানার দলিলের সমান্তরালে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত পরিশ্রমে ও মেধায় কোথাও কোথাও সে কাহিনি লেখা হয়—যেমনটা দেখি ‘নোয়াখালির ইতিহাসে’।

 প্যারীমোহন সেন তৎকালীন নোয়াখালির মাধব সিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিকটবর্তী বেগমগঞ্জ মধ্য ইংরেজি স্কুলে ১৮৫৭সালে তিনি প্রধান শিক্ষক পদে বৃত হন। পরবর্তীতে স্কুলটি হাইস্কুলে উন্নীত হলে (বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট হাইস্কুল)তিনি সাধারণ শিক্ষকের পদমর্যাদায় ফিরে আসেন। গ্রন্থটির ১০০পৃষ্ঠায় নোয়াখালির ভৌগোলিক, সামাজিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ৪১টি পরিচ্ছেদে বিবৃত হয়েছে। পরবর্তী আটটি পরিচ্ছেদে নোয়াখালি অঞ্চলের প্রধান ভূসম্পত্তির মালিকদের বংশ পরিচয় উল্লিখিত হয়েছে—যা দ্বিতীয় সংস্করণে পুনরায় সংশোধিত করেছেন তিনি। প্রথম পর্বে নোয়াখালির এক চিত্রল ভৌগোলিক পরিচয় দিয়েছেন লেখক; ক্রমে এসেছে ঐতিহাসিক সূত্রে সেখানকার অধিবাসীদের পরিচয়। প্রাক মোঘলযুগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ উপনিবেশ পর্বে জমির মালিকানা ও অঞ্চল বন্দোবস্তের সূত্রে নোয়াখালির এক অন্তরঙ্গ পরিচয় উপস্থাপনের চেষ্টা রয়েছে। নোয়াখালির অন্তর্গত ভুলুয়া, যোগদিয়া পরগনা, বাবুপুর পরগনা, গোপালপুর পরগনা, জয়নগর ও কাঞ্চনপুর পরগনা, এলাহাবাদ ও দানড়া পরগনা, সায়েস্তানগর-বেদরাবাদ-আমিরাবাদ-স্বন্দীপ-হাতীয়া চাকলা ও বামনী চাকলার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন লেখক। এসব পরগণার উচ্চবর্গীয় জমিদারবংশের আলোচনা সেই ইতিবৃত্তের কেন্দ্রে থাকলেও সাধারণ অধিবাসীরা হারিয়ে যায় নি তাঁর দৃষ্টি থেকে। মুসলমান আক্রমণ, আধিপত্য ও বসতি স্থাপন যেমন ঐতিহাসিক সূত্রে এসেছে তেমনই বর্ণিত হয়েছে ইংরেজ অধিকার ও বর্তমান জেলার রূপান্তরের কাহিনি। লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি তাঁর ইতিহাস বর্ণনাকে  চিত্তাকর্ষক করে তুলেছে। পূর্বে নোয়াখালির রাজস্ব ও দেওয়ানি বিভাগ ত্রিপুরার অধীন ছিল। ১৮৩০সালে নোয়াখালির জন্য স্বতন্ত্র কালেক্টর নিযুক্ত হন এবং ১৮৭৬সালে নিযুক্ত হন একজন স্বতন্ত্র সিভিল সেশন্‌ জজ—এভাবেই গড়ে উঠতে থাকে নোয়াখালির শাসনতান্ত্রিক কাঠামো।

 গ্রন্থটির উপসংহার অংশটিতে প্যারীমোহন সেন চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ উপনিবেশ সমকালীন দুরাবস্থার কথা। সাধারণ মানুষের সেই দুরবস্থার জন্য অশ্রুপাত নয়া করে পুরানো গৌরবের কথা স্মরণ করে বলীয়ান হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছেন তিনি। এই আত্মপ্রত্যয়ী উচ্চারণে এক জাতীয়তাবাদী ধারণার প্রক্ষেপ লক্ষ্যনীয়। তিনি বলছেনঃ

“পূর্বে এই জিলার ভূমি যথেষ্ট শক্তিসম্পন্ন ছিল।সুপারি, নারিকেল ও কৃষিলব্ধ আয়ের দ্বারা অনেক পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদন নির্বাহ হইত। পূর্বে সুখ স্বাচ্ছন্দে কালাতিপাত করায় এই জিলার লোকগণ পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি ঐদাসীন্য প্রকাশ করিতেন। এইক্ষণে সুপারী, নারিকেল ও অন্যান্য কৃষিলব্ধ আয় কমিয়া যাওয়ায় লোকসংখ্যা বৃদ্ধিহেতু এই জিলার জনসাধারণের অবস্থা অতীব শোচনীয় হইয়া দাড়াইয়াছে। ...অনেক পরিবার অর্ধাশনে বা অনশনে জীবনযাপন করিতেছে। দেশহিতৈষী বা সমাজের মঙ্গলেচ্ছু ব্যক্তি মাত্রেরই এই বিষয়ের প্রতিকারের যত্ন করা অবশ্য কর্তব্য বলিয়া মনে করি। ...পূর্বের ন্যায় এক্ষনেও এ জিলার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিশেষ সম্প্রীতি রহিয়াছে। দিন দিন উভয় সমাজ শিক্ষাবান ও অর্থবলে উন্নতিসাধন করিতে পারিলেই দেশের মঙ্গল সাধন হইবে। অন্য আত্মকলহে উভয় সমাজের উন্নতি বহুদূর পশ্চাৎগামী হইবে। তাই হিন্দু-মুসলমানগণ আর কতদিন মোহনিদ্রায় নিদ্রিত থাকিবে। জগতের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া দেখ জগতের প্রত্যেক দেশে উন্নতির স্রোত প্রবাহিত হইতেছে। কেবল তোমরাই ঘোর নিদ্রায় নিদ্রিত। সময়ে নিদ্রাভঙ্গ না হইলে তোমাদের নিদ্রা মোহনিদ্রায় পরিণত হইবে। স্বদেশ স্বজাতির ও আত্মোন্নতির এই মাহেন্দ্র সুযোগ ছাড়িও না। জ্ঞানার্জন শলাকা দ্বারা মোহনিদ্রা প্রথমত ভঙ্গ কর তৎপরেই তোমাদের স্ব স্ব কর্তব্য কার্য্য হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবে”।  

গ্রন্থটি সম্পাদনা করে পুনর্মুদ্রিত করেছেন কমলাক্ষ দাস—সেজন্য তিনি ধন্যবাদার্হ্য।

* গবেষণা প্রকল্পের জন্য গ্রন্থটি সংগ্রহ করে দিয়েছেন রাজকুমার পাল।

 

মননকুমার মণ্ডল
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
স্কুল অব হিউম্যানিটিস
নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

Coming out of Partition: Refugee Women of Bengal

Coming out of Partition:
Refugee Women of Bengal

Gargi Chakravartty
New Delhi: Bluejay Books, 2005
ISBN 81-88575-45-3; Pages- 200; Paperback

 

Rarely do we come across a book which reveals women’s history squarely and bluntly. Most partition histories rue over women as victims thus suppressing the other ‘agential’ role of women which might have had a chance to surface. Gargi Chakravartty’s Coming out of Partition: Refugee Women of Bengal ,is certainly an exception to the one sided portrayal of history, society and politics of Partition. The book is in five chapters- the first dealing with the 1946 riots in Noakhali and Tippera which foregrounds the Partition of the Indian subcontinent (“Abandoned Ancestral Home”) down to the events upto 1950, the second chapter deals with hazards, struggles and political triumphs of women in the course of migration and displacement from East Pakistan and settlement in new colonies in West Bengal (“Political Activism of Refugee Women”). The third deals with the spatial loss post partition and its impact on women, leading towards self reliance of women. This part also deals with the cultural construct of the colony (“The Crossover: Towards a New Social and Cultural Milieu”).“Partition in the Lives of Bengali Muslim Women” is the significant fourth chapter of the book which takes a look into the lives of Muslim women who chose to stay back in West Bengal after Partition. There is also a comparative study of the cultural and social status of Muslim Women in West Bengal and East Pakistan (Bangladesh) after Partition. The fifth and last part is an eye witness account of the 1964 riots in Calcutta when the author was a 1st year graduate student. The Foreword written by Tanika Sarkar clearly mentions that the book ‘promises a valuable… expansion’ in the field of Bengal Partition through a feminist lens and looks into the inner lives and experiences of women. In a very strong Introduction, the author states that the book seeks to shed light on the ‘relatively neglected’ domain of Bengal Partition- ‘nature of migration and about the pattern of rehabilitation’. However, Chakravartty is focused on the problems and questions of women’s activism in the holocaust, which stems from her first hand experience of growing up in the peripheries of a refugee colony. Generically a historiography, this book often and naturally meanders into becoming a non-fiction with its intimate and personal style of writing. Occasional interpolation of poetic passages from a renowned poet or an unsung woman refugee establishes the emotional engagement of the author with the process and the effect of partition. But the book is powerful not because of the frequent literary vibes, but because of its efforts to put together rare facts and data which a researcher on Partition will find priceless. Although graphs and maps could have bolstered the already strong writing, the book does establish itself as a source text of future researches on women of Partition to come in the later years- some of which have been published under the aegis of very prestigious institutions like the Women’s Studies Department of Jadavpur University. The fourth section of the book has invaluable mentions of the career and activism of Bengali Muslim women, which so far has received scant attention. This precious, slim, volume does have a flaw. While it balances perfectly all sides of the story of Partition, the political leaning and the attribution of all good work for women refugees being bestowed upon certain kind of people with fixed ideological underpinnings, is too glaring to be missed. For this reason, at times, the book becomes a manifesto of a kind. But this can be overlooked, given the fact that Chakravartty has left no stone unturned to bring into this volume almost everything one needs to know about women in Bengal Partition.  Fortified with scholarly notes, appendixes containing interviews and a rare bibliography this is a must read for researchers in this domain of study.  

 

Dr. Sharmistha Chatterjee (Sriwastav)
Associate Professor and Head
Department of English
Aliah University
Kolkata

 

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

ভাগফল ৭১ মেয়েদের কথা

ভাগফল ৭১ মেয়েদের কথা
উৎসর্গ : যুদ্ধ,দাঙ্গা, দেশভাগ আর রাষ্ট্রবিপ্লবে বিপর্যস্ত সকল মা’কে
সঙ্কলন ও সম্পাদনা : ঝর্ণা বসু
আলোকচিত্র : কিশোর পারেখ
প্রচ্ছদ : রঘু রাই

প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৮
প্রকাশক : লিরিক্যাল বুকস
মূল্য : ৪৫০ টাকা

 

একটি বই টেবিলে থাকলে যদি সেখানে উপস্থিত পাঁচ জনের দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষিত হয়, বইটির বিষয় বা বৈভব না জেনেও, তখন বোঝা যায় বইটির প্রকাশে বহু মানুষের যত্নের ছাপ আছে। প্রচ্ছদ ও নাম যে কত গুরুত্বপূর্ণ তাঁর প্রমাণ এই বইটি। সম্পূর্ণ সাদা-কালোয় চোখ টানা প্রচ্ছদটির অর্ধাংশ ঘিরে রয়েছে ভাঙ্গা-চোরা স্বপ্ন ও সংসারের টুকরো আর ভবিষ্যতের অনন্ত জিজ্ঞাসা ভরা দৃষ্টি নিয়ে শরণার্থী শিবিরে শায়িত এক নারীর আলোক চিত্র। প্রচ্ছদের ওপরে গ্রন্থ নাম ‘ভাগফল ৭১ মেয়েদের কথা’ । প্রচ্ছদটি এতই বাঙ্ময় যে, গ্রন্থের বিষয় আলাদা করে বলার প্রয়োজন হয় না।

 ১৯৭১ এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সেখানকার মেয়েদের জীবনে নেমে আসে যে করাল ছায়া নেমে আসে, চার লক্ষেরও বেশি মেয়ের জীবন, যৌবন, স্বপ্ন ও চোখের জলের বিনিময়ে যে মুক্তি কিনেছে বাংলাদেশ, সেই বিপুল বিজয়ের মুক্তিযুদ্ধকেই নারী অভিজ্ঞতার ক্ষুদ্র মুকুরে দেখার প্রচেষ্টা এই গ্রন্থটি। মুক্তিযুদ্ধে যাতনার শিকার ষোলটি সাধারণ মেয়ের হাড়-হিম করা জবানবন্দীর দলিল এই সঙ্কলন। সম্পূর্ণ অন্য মাত্রার এই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন ঝর্ণা বসু।

পুর্বতন পুর্ববঙ্গের খুলনা জেলার বাগেরহাটের কন্যা ঝর্ণা বসু ;১৯৭১-এ নিজের চোখে বাবাকে খুন হতে দেখেন রাজাকারদের হাতে। অতঃপর শরণার্থী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন । শিক্ষান্তে বাগেরহাট গার্লস কলেজে পাঠদান । বর্তমান আবাস উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত । তাঁর সম্পাদিত ‘অবরুদ্ধ অশ্রুর দিন’, ‘হৃদয়ের টুকরোয় গাঁথা’ প্রভৃতি গ্রন্থে বারংবার ফিরে আসে  বাংলাদেশে বিপন্ন নারীদের অশ্রু ও সংগ্রাম ।

সমগ্র বইটি ষোলজন নারীর অসহায়তার জবানবন্দী। বইটির অঙ্গ সজ্জা হিসেবে রয়েছে পাতায় পাতায় অকাল প্রয়াত চিত্রগ্রাহক কিশোর পারেখের মুক্তিযুদ্ধকালীন তোলা সাদা-কালো আলোকচিত্র। এই আলোকচিত্রগুলি লেখার সঙ্গে সংগতি রেখে '৭১-এর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ও মেয়েদের ভয়ঙ্কর ভাঙনকে তুলে ধরে । যে ষোলজন মেয়ের জবানবন্দী নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে দুজন মুসলিম ও বাকি সবাই হিন্দু পরিবারের মেয়ে। এই ষোলোজন নারীদের সংকলক বেছে নিয়েছেন সমাজের সর্বস্তর থেকে। চার সন্তানের জননী গ্রামের গৃহবধূ ইলারাণী ঘোষ আছেন। ‘সারা বছর ঘর সংসার করা মেয়েলোক’ কিরণময়ী মণ্ডল । আবার শিক্ষক শ্বশুর ও শিক্ষক স্বামীর শিক্ষিত বধূ আশালতা হালদারও আছেন। রোখসানা দিল আফরোজ ছিলেন চিকিৎসক পিতার সন্তান। সংস্কৃতিমনস্ক, শিক্ষানুরাগী, নাট্যপ্রেমী পরিবারের সন্তান। এইসব ভিন্ন ভিন্ন পরিবার-পরিবেশের মেয়েরা যে জবানবন্দী দিয়েছে তা কম বেশি একই নির্মমতা , নৃশংসতা ও অসহায়তার দীর্ঘশ্বাসে ভরা । সংকলনে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে ঝর্নারানি বিশ্বাস ও অনুরূপা ভৌমিকের জবানবন্দী । ঝর্নারানী বিশ্বাস শিক্ষিত ও বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনার সূত্রে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন আরও নানাজনের অভিজ্ঞতার কাহিনি । তাঁর লেখার মধ্যেই আমরা আরও তিনজন মহিলার কথা চিঠির বয়ানে পাই । অনুরূপা ভৌমিক পরিবার ও সমাজের বহু প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে অকাল প্রয়াত মায়ের অনুপ্রেরণায় বরিশাল উইমেনস কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হন ও স্কুল শিক্ষিকা হিসশবে কাজে যোগদান করেন । স্বাধীন বাংলাদেশেও বাকি আর সমস্ত মহিলাদের মতোই তাঁকে অসম্মান ও সংগ্রাম হাতিয়ার করে লড়তে হয়েছে । ১৯৮৩ সালে তিনি আরও একবার তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে নির্মমভাবে আক্রান্ত হন। স্বাধীনতার পরেও এইসব মেয়েরা অনেকেই নিজের দেশে বসবাস করতে পারেন নি বা ভয়াবহ আতঙ্কে দিন যাপন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ এই নারীদের জীবনে কোন নতুন সূর্যের আলো এনে দেয় নি।

এই বইয়ের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব ইতিহাসের নবনির্মাণে । যেকোন দেশের যেকোন যুদ্ধের মত মুক্তিযুদ্ধ শুধু ৪৭ থেকে ৭১এর রাজনৈতিক ঘটনাবলী নয় । যেকোন যুদ্ধের ইতিহাস শুধু রাজনীতির চাপান উতোর ,  নেতৃত্বের হত্যা বা প্রতিহত্যার ঘটনা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না । যারা প্রান্তবাসী মানুষজন, তারও প্রান্তিক নারী , যারা যুদ্ধে বিজয়ীর লুটের মাল হিশেবে গণ্য হয় , তাদের চোখের জলের নোনা দাগ,  যুদ্ধের এক সমান্তরাল ইতিহাস ও আলেখ্য রচনা করে । ঝর্ণা বসু সেই আলেখ্যকেই সুসম্পাদিত করেছেন।

এই গ্রন্থের আরও একটি বড় সম্পদ এর কথন ভঙ্গি। পৃথক পৃথক পরিবার ও পরিবেশ থেকে উঠে আসা মেয়ের ভিন্ন আত্মকথন ভঙ্গি ও ভাষা প্রায় একই ধরণের বিবরণকেও ভিন্ন মাত্রা দেয়। আর উল্লেখ না করলেই নয়, প্রতিটি আত্মকথনের শেষে মুক্তিযুদ্ধের কবিতার অংশত। প্রতিটি মেয়ের অভিজ্ঞতার যন্ত্রণা ও অশ্রুবিন্দু জমাট হয়ে যেন শেষে কবিতার অংশটি রূপ পাচ্ছে । ছবি ও কবিতা দিয়ে সাদা-কালোয় সাজানো যাতনার এই চাপ চাপ অন্ধকার যেন সিনেমার রিলের মত একের পর এক আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত ছবি হয়ে ওঠে ।  

 

ড অনিন্দিতা দাশগুপ্ত
এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, গুরুদাস কলেজ,
aninditadasgupta72@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

প্রসঙ্গ: পি এল ক্যাম্প

প্রসঙ্গ: পি এল ক্যাম্প
আভা সিংহ
সুমুদ্রণ ।।৫২৮ এম বি রোড, কলিকাতা।। প্রকাশ: ২০০২
প্রপ্তিস্থান: পত্রপুট, কলিকাতা ৯
মূল্য: চল্লিশ টাকা ।। পৃষ্ঠা ৮০

 

দেশভাগের অব্যবহিত পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে অগণিত উদ্বাস্তু মানুষের ঢল নামে। সীমান্ত পেরিয়ে পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ও উদ্বাস্তু মানুষ কলকাতা ও জেলা শহর-গ্রামে বাঁচার তাড়নায় আশ্রয় নেন। বাংলায় পার্টিশন জনিত উদ্বাসনের ফলে যে ভয়াবহ সামাজিক-অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয় তা অভূতপূর্ব। এই বহুমাত্রিক সঙ্কটের যে পরিসর পরবর্তী পঞ্চাশ-ষাট বছরে লাগু থেকেছে তাতে জেলাগুলির উদ্বাস্তু ক্যাম্প ও কলোনিগুলি যথেষ্ট গুরুত্বসহ বিবেচিত হয় নি। বৃহত্তর অর্থে বাংলার পার্টিশন আখ্যানের যে বিস্তার সেখানে উপেক্ষিত থেকেছে। এই গ্রন্থ উদ্বাস্তু আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতা ও ব্যক্তিত্ব অনিল সিংহের স্ত্রী আভা সিংহ লিখেছেন একথা ঠিক, কিন্তু এমন ভাবনা নিশ্চয়ই তাঁর স্বামীও পোষণ করতেন।

 

‘পার্মানেন্ট লায়াবিলিটি ক্যাম্প’ বা পি এল ক্যাম্প এরকম কিছু ক্যাম্প যা উদ্বাস্তু মানুষের আশ্রয়স্থল ছিল।কিছু জায়গায় আজও আছে। দেশভাগ পরবর্তীতে ১৯৫০এর ঘূর্ণিঝড়-বন্যা বিধ্বস্ত বাংলায় নতুন করে কয়েক লক্ষ মানুষকে আশ্রয়হীন করে তোলে। তাঁদের অনেকের আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়ায় হুগলির বাঁশবেড়িয়া ও ভদ্রকালীর ক্যাম্প, উত্তর চব্বিশ পরগনার হাবড়া-টিটাগড়ের ক্যাম্প, নদীয়ার ধুবুলিয়া বা কুপার্স মহিলা ক্যাম্পে অথবা রাণাঘাটের চাঁদমারীর মহিলা ক্যাম্প। পরবর্তীতে সেখান থেকে অনেকে পুনর্বাসন পেলেও বেশ কিছু পরিবার এখনো আছে। কৃষ্ণনগরের কাছে চামতা ক্যাম্প এরকম একটি পার্মানেন্ট লায়াবিলিটি ক্যাম্প। লেখিকা আভা সিংহের এই ক্যাম্পে চাকরির অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই আখ্যান। ব্যক্তিগত গদ্য রচনার মত; কাহিনির বুনট বলতে ওই ক্যাম্পের আধারই সেসব স্মৃতিকে গ্রথিত করে রাখে।

 

ডায়েরির পাতা থেকেই এই গ্রন্থের বিস্তার। এক খররৌদ্রের দুপুরে বাসুদেবপুর ক্যাম্প থেকে চামতা মহিলা পি এল ক্যাম্পে চাকরি নিয়ে আসে। কৃষ্ণনগর-নবদ্বীপ লাইট রেলওয়ের ধারে ৮৫একর জমির ওপর এই ক্যাম্প। জায়গাটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের এক পরিত্যক্ত মিলিটারি ব্যারাক ছিল, বর্তমানে তা প্রায় ধংসস্তুপের চেহারা নিয়েছে। বর্ষিয়সী স্বর্ণলতা সোম এই ক্যাম্পের সুপার, সহ-সুপার নীলিমা সেন ও স্টোর-কীপার কল্যানী বোস। এই প্রমীলা রাজ্যে মাত্র তিনজন পুরুষ চাকুরিরত, গ্রুপ-ডি কর্মী সতীশ দাস, ডাক্তার তড়িৎরঞ্জন মিত্র ও করণিক কিশোর দেব। এক দঙ্গল মহিলা সহায়িকা ক্যাম্পে থাকেন, চব্বিশ ঘন্টার আবাসিক চাকুরি তাদের। আর আছেন একদল শিক্ষিকা—বেশিরভাগই স্কুল-ফানাল উত্তীর্ণ বা অনুত্তীর্ণা। প্রায় পনেরশ’ মহিলা ও বাচ্চার আবাসস্থল। নির্মলা এসেই দেখে এখানে জীবন অন্যরকম। অব্যবস্থা, স্থান-সঙ্কুলান, বীভৎস মানবিকতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানিয়ে চলার অনপনেয় বাধ্যতা এদের ভবিতব্য। দুর্দশা পীড়িত, রোগাক্রান্ত ক্যাম্পে সর্বদাই চলছে মৃত্যু-মিছিল। মাঝেমধ্যে ক্যাম্পে আসে ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হওয়া মহিলারা; যেমন মধ্যবয়সী বিধবা অমিয়া কিম্বা সধবা মা সীতা, শিউলি-রত্না-উর্মিমালার মত মেয়েরা। এদের অবর্ণনীয় দুর্দশার বয়ান লেখা থাকে নির্মলার মত নারীদের কলমে। পি এল ক্যাম্পে রবীন্দ্র-জয়ন্তী পালন, রাঁধুনি ঝর্ণা’র-মা রান্না-বান্না, একসাথে দুপুরে-রাত্রে খাওয়া-দাওয়া, প্রবল ঝগড়া, হৃদয়ঘটিত কারবার, বর্ষায় বিনিদ্র রাত্রি জাগরণ, আগুনের হলকার মত ছড়িয়ে পড়া গুজব, ক্লাশ-ফোর উত্তীর্ণাদের বিদায়-সম্বর্ধনা, বিধ্বংসী ঝড়, শ্রীপতির মত কিশোরের জীবন-পরিবর্তন ও অপঘাতে মৃত্যু এবং সবশেষে ২৯-০৯-৫৬ থেকে ৪-১০-৫৬নির্মালার ডায়েরির দিনলিপি—যেখানে কৃষ্ণনগর-নবদ্বীপের ভয়াবহ বন্যায় নিঃসহায় ক্যাম্পবাসীদের মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষার প্রত্যক্ষ বর্ণনা—এসব বাস্তবতার নির্মেদ বয়ানে ঠাসা এই গ্রন্থ। প্রতিটি উদ্বাস্তু মানুষ যেন একেকটি গল্প বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে—তারপর তারা জনমানসে মিশে যাবে। 

 

এখানে মহিলা লেখিকার বয়ান লক্ষ্যনীয়ভাবে মার্জিত, সুশৃঙ্ক্ষল—যা উদ্বাস্তু বয়ানের চালু বীভৎসতাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখায়। অমানবিক প্রতিটি বীভৎসতা এখানে অদ্ভুতরকম বিষাদে পরিপূর্ণ। নিঃসহায় অবস্থার মধ্যেও প্রাণের আনন্দের খোঁজ বাঁচিয়ে রাখেন তিনি। রিফ্যুজি-চর্চার পরিসরে বয়ান বা ন্যারেটিভে লৈঙ্গিক পুনর্নির্মাণের প্রশ্ন আজ আলোচিত। তুষের আগুনের মত জ্বলতে থাকা নারীকথনের এইসব সংবেদনগুলি আমাদের ভাবায়—প্রশ্ন তুলতে সাহায্য করে।

 

 

মননকুমার মণ্ডল
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
স্কুল অব হিউম্যানিটিস
নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

সেই তো আমার আমি

সেই তো আমার আমি
মুক্তি চৌধুরি

প্রতিভাস।।কলকাতা।।সেপ্টেম্বর ২০১৩
মূল্য ১০০টাকা, পৃষ্ঠা ৯৫

 

বাঙালির পার্টিশন বয়ানে নারীর স্বর প্রায়শই অনুপস্থিত থেকেছে। কিন্তু পশ্চিমপ্রান্তের পাঞ্জাব পার্টিশন বিষয়ক সমাজতাত্ত্বিক গবেষণাতে এমন বয়ান উদ্ধৃত হয়।পূর্ব-ভারতের পার্টিশনে যে বহুমাত্রিকতা ও প্রলম্ব স্বরান্তর—সেখানে নারীর আত্মকথনের আখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি সে সব কথা মৌখিক আখ্যান সংগ্রহের সূত্রে উঠে। কেন্দ্র-প্রান্তের প্রচলিত তর্ক-পরিসরের মধ্যে সেজন্য লৈঙ্গিক প্রশ্ন পার্টিশন-আখ্যানে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৪৭-এর বাংলা-পার্টিশনের সঙ্গে ঐতিহাসিক ভাবে জুড়ে থাকা আসামের পার্টিশন-আখ্যান এর ব্যতিক্রম নয়। পার্টিশনের আলোচনায় আসামের বিভাজন ও তার মানবিক যন্ত্রণাময় উপলব্ধিগুলি ব্রাত্য থেকেছে অনেককাল; আর তার মধ্যে আসামে বসবাসকারী বাঙালি নারীর আত্মকথন আরও কম এসেছে আমাদের হাতে। মুক্তি চৌধুরি তেমনই একজন বিদূষী মহিলা যিনি তাঁর পারিবারিক পূর্ববঙ্গীয় স্মৃতিকে সমকালের ইতিহাসে ফেলে নিজের ‘আমি’কে খুঁজে বেড়ানোর কাহিনি শোনাতে পারেন। আড়াল বলতে শুধু ‘খেয়ালি’ নামটি; যা এক ‘আমি’ আরেক ‘আমি’র সম্বোধনে মধ্যস্থতা করে।

প্রাথমিক কৈফিয়েতে নিজেকে খোঁজার সেই উপক্রমণিকায় তিনি লেখেনঃ

“আমি যে দেশে জন্মেছিলাম, আমার সে দেশ হঠাৎ একদিন বিদেশ হয়ে গেল। তাই আমি এখন শুধু পুরানো সেই দেশের মানচিত্রে ঘুরে বেড়াই। সিন্ধু আর পঞ্চনদীর তীর থেকে অনায়াসে চলে যেতে পারি পদ্মাপারে। কারণ মানচিত্রের মণ্ডপে যত্রতত্র চলতে ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয় না, আবশ্যক হয় না কারো আনুগত্যের; শত্রু-মিত্র প্রমাণ করতে কোনো অগ্নিপরীক্ষাও দিতে হয় না। ফলে নির্বিঘ্নে এসে আমার জন্মস্থানটি স্পর্শ করে ভূমিমায়ের নিশ্চিন্ত কোলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারি”।...

“দেশভাগের দহনে স্বভূমি-চ্যুত এমনি এক বালিকার শৈশব-কৈশোরের সকরুণ সংকট-কাহিনি চিত্রিত হয়েছে এই স্বল্পপরিসর গ্রন্থে। তার ‘সেই আমি’ আর ‘এই আমি’র মনযমুনায় ঢেউ ভেঙে ভেঙে নিজেকে খুঁজে সে কতবার কেঁদেছিল, কোনো ইতিহাসেই নেই সেই আলেখ্য”।

 পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে ‘খেয়ালি’র জীবনকথা নিয়ে এই গ্রন্থ। সস্নেহ আদরে প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক বৃত্তের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে তার বড় হবার কথা, পরবর্তীতে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার কথা। অধুনা পূর্ববঙ্গের সিলেট জেলার মৌলবি বাজার মহকুমার কুলাউড়া জংশন স্টেশন থেকে কুলাউড়া-সিলেট রেললাইনের ওপর ছপাখন স্টেশনের কাছে গোপীনাথপুর গ্রামে তাদের বাড়ি ছিল। সেখানের সামাজিক সম্প্রীতি, আনন্দের দিন-গুজরান তাঁকে স্মৃতিমেদুর করে। মা-ঠাকুমা-পড়শী বয়োঃজ্যেষ্ঠদের লোককথা, গান, ছড়ার আশ্চর্য সম্ভার আজও জীবনের গোধূলিলগ্নে প্রবল আকর্ষণ জাগিয়ে তোলে। সঙ্ঘবদ্ধ জীবন সংলগ্নতা সমান্তরাল তৈরি করে আজকের বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে। বিস্ময় প্লাবিত সেই কৈশোর থেকে গুয়াহাটি আসা পর্যন্ত, ১৯৪৭ ও ১৯৫০এর পূর্ববঙ্গ আসামের ভবিষ্যত যখন নির্ণিত হচ্ছিল এক আশ্চর্য ঐতিহাতিকতায়, সে সময় এক নারী নিজস্ব কৃতিতে জীবনপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন আরো অনেকের মতই। গৌহাটি, কলকাতা পথে প্রতিষ্ঠানে সেই আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত। এই খেয়ালিই গৌহাটি কটন কলেজের অধ্যাপিকা, প্রখ্যাত লেখিকা ইন্দিরা গোস্বামীর বান্ধবী মুক্তি চৌধুরি।

 গ্রন্থটিতে অসম গনভোটের সময় যেমন ছয়া ফেলেছে তেমনই আসাম-গৌহাটির উত্তাল সময়ের কথা উঠে এসেছে। ছাত্র-আন্দোলনকে বাইরে থেকে দেখার সংবেদনশীল মন, বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান শোনার(১৯৫৪-৫৫সালে গৌহাটিতে)বর্ণনীয় অভিঞ্জতা খেয়ালি’র মনে পড়েছে। কথা শেষ করেছেন আত্মবিভাজিত দ্বৈততার বিভ্রম কাটিয়ে উঠতে না পারার যন্ত্রণাবোধ থেকে। দেশভাগের করাল গ্রাস যেন চৈতন্যের ওপর প্রবহমান এক অনন্ত পদ্মাপাড়ের ভাঙনের মত। নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলেছেন লেখিকা – “আচ্ছা, এই যে তোমার ‘আমি’র টানাপোড়েন, ‘আধখানা আমির সঙ্কট, এর থেকে কি কোনো সঞ্চয়ই নেই জীবনে?”; নিশ্চয়ই আছে। তাই তো পুনশ্চে দেখি পুনর্বার সেই জন্মভূমির মাটিতে গিয়ে প্রণাম করেন, বদলে যাওয়া পরিবেশের মধ্যেও খুঁজে পান পরিচিত গাছপালা-মাটির নিশানা। লালন ফকিরের সাধনপীঠে সদ্য-কেনা একটি ছোট্ট ‘একতারা’ আর ‘জনমভূমির মাটি’ নিয়ে ফিরে আসেন উদ্বাসিত নতুন পরিচয়ে। এভাবেই একজন নারী এগিয়ে যান, আর মানুষও।  

 

মননকুমার মণ্ডল
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, স্কুল অব হিউম্যানিটিস
নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
mkmnsou@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

Mapmaking : Partition Stories from Two Bengals

Mapmaking : Partition Stories from Two Bengals
Edited by: Debjani Sengupta

Foreword by: Ashis Nandy
Publisher: Amaryllis, New Delhi; 2011, Pages: 207
Price: Rs. 295

 

The book Mapmaking: Partition Stories from Two Bengals consists of 12 short stories. All the short stories have been translated from Bengali to English. Of the 12 short stories, 6 stories are from West Bengal, India and the other 6 from Bangladesh. The book has been edited by Debjani Sengupta. The stories in the book have been translated by both Rani Ray and Debjani Sengupta. She teaches English at Indraprastha College, New Delhi. The stories that have been chosen for translation were originally written by famous Bengali writers such as Manik Bandopadhyay, Ritwik Ghatak from India and Selina Hossain from Bangladesh. The stories relate to the 1947 partition and it mainly focuses on Bengal partition. The book has a local flavor as it narrates stories from both perspectives. The first part of the book named as ‘Stories from India’ have stories of migration, loss, refugeehood from the perspective of those who migrated from East Pakistan (now Bangladesh) to India. On the other hand, the second part of the book ‘Stories from Bangladesh’ describes the stories of those who were leaving India and were entering a new country called Pakistan. Both the parts of the book meticulously present the after effect of partition on both sides of the border.

 

The foreword of the book has been written by Ashis Nandy, a renowned social theorist. The afterword of the book has been written by Debjani Sengupta herself and gives a very appropriate context on partition and its representation in films, literature, arts etc. It also explains the rise of the refugee colonies in West Bengal, their unionization and rise as a political power group. She explains their struggles, rebuilding from scratch and its political, social and economic implications. Ashish Nandy, in the foreword, on the other hand, argues about the general silence around partition and tries to explain the reasons behind it. The arrangement of the book is thus impressive. As Ashish Nandy draws the tone on partition, we enter the lives of those on ‘this’ and ‘that’ side of the border through the short stories. The book ends with the afterword explaining the life of refuges post migration. Going though the stories, it becomes clear that no side was spared. The devastation was equal on both sides. We find one character being pushed into prostitution for bare necessities, while another gives birth in a train while migrating. In one, we find a character becoming a guest in his own house while another character becomes perpetually ‘caged’ into ‘other’ country, being unable to migrate. The book explores the many layers of psychological, emotional and social threads that bind the narrations together to form a whole.

 

 

Sarita Bose
Lecturer, Department of Mass Communication
Rabindra Bharati University, Kolkata
Email: bose.sarita@gmail.com

 

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

উজানতলীর উপকথা : শিকড়ের সন্ধান

উজানতলীর উপকথা : শিকড়ের সন্ধান
কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর

২০৭ পৃষ্ঠা, প্রাপ্তিস্থান চতুর্থ দুনিয়া। স্টল ২২,ভাবানী দত্ত লেন, কলকাতা-৭৩, প্রকাশক ঊষারঞ্জন মজুমদার, গ্রন্থস্বত্ব : শ্রীমতী কল্পনা ঠাকুর। অক্ষর বিন্যাস : সরদার মনোজ নারায়ণ। হরিহর প্রেস, সীতারাম ঘোষ স্ট্রীট কলকাতা-৯, রচনাকাল (১৯৯৪-২০০০) সময় পর্যন্ত; প্রথম প্রকাশ ১লা বৈশাখ ১৪০৭, মূল্য-৭৫.০০(পচাত্তর টাকা)।

 

কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর পেশায় ব্যাঙ্ক কর্মচারী। কলকাতার অনতিদূরে বামনগাছি অঞ্চলে তাঁর নিবাস। তিনি নিজেই একজন উদ্বাস্তু মানুষ। পিতৃদেব বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দেশভাগের বলি কোটি কোটি বাঙালির উদ্দেশে লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন। Belated Traveler হিসেবে লেখকের স্মৃতি 'হৃদয়ের বেদনার রঙে রঙে ছবি আঁকে।’  

 

উপন্যাসের একেবারে শেষে লেখক বলেছেন-‘এই উপন্যাসের সব চরিত্রই কাল্পনিক- এমন বলা গেলে ভালো হত, কিন্তু গেল না।’ আধুনিক লেখকের মতো আইনমাফিক দায় ঝেড়ে ফেলতে চাননি। সব চরিত্রই কাল্পনিক বলে, বাস্তবের কোন চরিত্রের আনিচ্ছাকৃত মিল থাকার জন্য দুঃখিত এমন ভাঁড়ামো তাঁকে করতে হয়নি। তিনি জীবনের সত্যকে তুলে ধরেছেন। ২৮ টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত এই উপন্যাস। গ্রন্থটির প্রতিটি পরিচ্ছেদকে লোককবির কবিতা ,গান অথবা ছড়া ব্যবহার-এর মধ্য দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছেন লেখক। বিশেষ ভৌগোলিক সীমার মধ্যে প্রচলিত এই লোকগান বা ছড়ার ব্যবহার তাঁর শৈলী-তে এনেছে চমৎকার আখ্যানের স্বাদ।

 

আগামী পৃথিবী কী অভিবাসীদের ? এমন প্রশ্ন অনেক চিন্তকদের মুখেই শোনা গেছে। গ্রন্থ প্রণেতা কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের এই রচনায় এমন চিন্তার যোগসূত্র পাওয়া যায়। উজানতলী ছেড়ে আসার সময় বৃদ্ধের মুখে উচ্চারিত হয়েছে-‘মাটি তুমি কার?’ বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার যে নমঃশূদ্র( লেঠেল ও চাষি) মানুষেরা আজ উদ্বাস্তু তাঁরা তো এই জেলার আদি বাসিন্দা নন! কবে, তাঁরা কোথা থেকে এলেন? উজানতলীর চারপাশ ঘিরে যে চারশো বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড তা ছিল জল-জঙ্গল আর অন্ধকারে নিমজ্জিত সেই অঞ্চলকে নমঃশূদ্ররা প্রকৃতির সমস্ত কিছুর সঙ্গে জীবনযুদ্ধ করে বাসযোগ্য করে তুলেছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি নীল বিদ্রোহের কথা বলেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদার ক্ষমতাধর হয়ে উঠলে যশোর, খুলনা, নদিয়াতে কৃষদের জীবন বিপন্ন হয়ে গেল। ফরিদপুরের পাঁচচরের কুখ্যাত নীলকর সাহেব ডানলপ এবং নদিয়ার ফেডী সাহেব ছিলেন ভীষণ  অত্যাচারী। অনেকবারই এই সব অত্যাচারী সাহেবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিশারদ কৃষকদের পাল্টা আক্রমণ সাহেবদের আরও জ্বালাময়ী করে তোলে। অচিরেই পুলিশি তাণ্ডবে বীর লাঠিয়ালরা পিতৃপুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে নৌকা ভাসাল নিরাপদ আশ্রয়ে, গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য হল। নতুন আস্তানা এবার ফরিদপুরের 'সবচেয়ে গহীন জল-জঙ্গলে ঘেরা এই প্রান্তরে।'

 

তাঁদেরই হাতে গড়া এই ভূমির পেট চিরতে জমিদার, জোতদার, বর্ণবাদী নেতাদের ইচ্ছেপূরণ হ’ল। ধর্মীয় বাতাবরণকে সামনে রেখে নিম্নবিত্ত ও নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানের সমন্বয়ের দাবি কিছুতেই আমল পেল না। লেখক উল্লেখ করেছেন- 'জুন মাসের বাইশ তারিখ বাংলার আইনসভায় ভোটাভুটিতে বঙ্গবিভাগ অনিবার্য হয়ে পড়েছে।' কেন্দ্রের আইনমন্ত্রী যোগেন মণ্ডল 'তোমার পাশ আলেই (পাশের জমির মালিক) তোমার প্রকৃত বন্ধু। হোক সে হিন্দু বা মুসলমান।' এ বাণী শুকিয়ে মারা গেল। উজানতলির বুক শূন্য করে শিকড় ছিঁড়ে আবার অভিবাসনে পাড়ি দিল। নিম্নবর্ণের হিন্দু নমঃশূদ্ররা।  

 

এ প্রসঙ্গে বলবার যে, এই বিশেষ শ্রেণির মানুষের উচ্চারিত ভাষার  অক্ষর বা ধ্বনি নেই! লেখকও বিভিন্ন শব্দে সেই স্বনিম আনতে পারেননি। যেমন- 'আ'সে তোলবানে' এই 'আ'সে' শব্দটির উচ্চারণ লিখিত- এই রূপের মত নয়। আবার 'ঘুমায় আছে থাউক' এখানে 'আছে' এই ক্রিয়াপদের স্থানে 'রইছে' ক্রিয়াপদ অনেক বেশি প্রযুক্ত। এটুকু বাদ দিলে এই উপন্যাসে লেখক ব্যক্তি ও যৌথ স্মৃতির এক আসামান্য দলিল নির্মাণ করেছেন।

 

প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন রাহুল কুণ্ডু। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই প্রচ্ছদ, একটি কাঁথা বা আসনে নানারকম লোকসংস্কৃতি-র চিত্র নির্মাণ করে আসলে স্মৃতির খননই মানুষকে জীবনে বাঁচতে ও অগ্রসর হতে সাহায্য করে। এই searching জীবন্ত মানুষের অনন্তকালের সন্ধান।

 

 

ড উত্তম কুমার বিশ্বাস
সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইলঃ biswasskb7@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

একাত্তরের দিনগুলি

একাত্তরের দিনগুলি 
জাহানারা ইমাম

সন্ধানী প্রকাশনী ।। ঢাকা ।। প্রথম প্রকাশঃ ১৮৮৬
রজত জয়ন্তী সংস্করণ

 

ঢাকার ‘সন্ধানী প্রকাশনী’র বই জাহানারা ইমাম লিখিত একাত্তরের দিনগুলি । প্রথম প্রকাশ ১৯৮৬। বইটির রজতজয়ন্তী সংস্করণ হয়েছে । সুতরাং বইটির জনপ্রিয়তার ধারণা আমরা সহজেই করতে পারি । জাহানারা ইমাম একাধারে শিক্ষিতা, লেখিকা, বেতার ও সাংস্কৃতিক কর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সমর্থক । মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ র আহ্বায়ক হন । সাহিত্য কৃতির জন্য ১৯৯০ তে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান । আলোচ্য গ্রন্থটির নাম থেকেই বোঝা যায় এটি মুক্তিযুদ্ধকালীন ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ । ১৯৭১ এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দশটি মাস কে আলাদা অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন তিনি ।

 

 লেখকের স্মৃতিচারণে ১৯৭১ এর মার্চ মাস শুরু হয়েছে নেহাতই নিস্তরঙ্গ সুখী পারিবারিক জীবনের ছবি দিয়ে । একটি সুস্থ সচ্ছল পরিবারে কিভাবে ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধ ঢুকে পড়ল তার উত্তাল তরঙ্গ নিয়ে , তারই বিবরণ এই গ্রন্থটিতে । একজন নারীর দৈনন্দিন ঘর গেরস্থির টুকরো টাকরা ছবির মধ্যে নিশ্চুপে ঢুকে পড়েছে পুর্ব-পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা । আর ভীষণভাবে উপস্থিত আছে ‘বেতার’ নামক গণমাধ্যমটি । এই প্রসঙ্গে এসেছে ‘বিবিসি’ সহ বিভিন্ন রেডিও স্টেশন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগ্রামী ফ্রন্ট ‘স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র’র কথা । কিভাবে সেইসময় প্রকৃত খবরকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হত, আর কিভাবে স্বাধীনবাংলা বেতার তার তথ্য ও সংস্কৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে পৌঁছে দিত ঘরে ঘরে, তারই আখ্যান পাই । প্রতিদিনের জীবনের নাওয়া- খাওয়ার মধ্যে, মুড়ির মোয়া বানানো বা ঈদের উৎসবের মধ্যে পাকিস্তানি সেনার বর্বরতার আতঙ্ক আততায়ীর মতো ছায়া ফেলেছে । পরিবারের এক তরুণের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়াকে কেন্দ্র করে কীভাবে গোটা পরিবার গ্রথিত হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের উন্মাদনা ও সংগ্রামের সঙ্গে---তারই বয়ান এই গ্রন্থটি। স্মৃতিচারণ যখন শেষ হয়  ১৯৭১ এর ১৭ই ডিসেম্বরে , তখন এই সন্তানভীরু , নির্বিরোধী, কিন্তু আদর্শবাদী মা, গোর্কির ‘মা’-এর মতোই হয়ে ওঠে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধার মা। সংগ্রাম ও সহনশীলতার এক প্রতিমূর্তি ।

 

 জাহানারা ইমামের লেখনীর মূল বৈশিষ্ট্য হল, ভাষার স্বাচ্ছন্দ । তাঁর বহুমুখী প্রতিভা কোথাও তাঁর লেখনীকে ভারাক্রান্ত করে নি । এই স্মৃতিচারণে আমরা শিক্ষক,সাংস্কৃতিক কর্মী বা রাজনীতি-বোদ্ধাকে পাই না। পাই এক ঘরোয়া, সংসারী, স্নেহপ্রবণ, কখনও ভীরু, কখনও বা দ্বিধান্বিত এক নারী, স্ত্রী  ও মা কে । তাঁর লেখা পড়ে ভ্রান্তি হয়, তা যেন এক নেহাতই তুচ্ছ সংসার যাপনের ছবিমাত্র । এই ভ্রান্তি দূর হয় ক্রমশ যখন লেখা এগিয়ে চলে একাত্তরের মার্চ মাস ধরে সামনের দিকে। খুব অনাড়ম্বর ও সাধারণ ভাষা ও বর্ণনার মধ্যেই ঢুকে পড়ে রাজনীতির খুব গুরুত্বপুর্ণ মাইল ফলকগুলি । যেমন   ছেলে ও ছেলের বন্ধুদের হ্যামবার্গার খাওয়ার ইচ্ছে দিয়ে যে দিনটা শুরু হয়, তাঁর মধ্যে অবলীলায় এসে যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘটনা । এইভাবেই স্মৃতিচারণ ক্রমশ এক শ্বাসরোধকারী কাহিনির জন্ম দেয়, যা আবর্তিত হয় তার বিশ বছরের তরুণ সন্তান রুমীর মুক্তিযুদ্ধে প্রাণিত হওয়া, জড়িয়ে পড়া, যুদ্ধে যাওয়া ও গ্রেপ্তার  হওয়াকে কেন্দ্র করে । আর সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে এক সাধারণ মা ও হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধার মা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হ’ল, স্মৃতিচারণের এই উত্তেজনাময় আখ্যান শেষাংশ; শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মধ্যে দিয়ে নয়, বরং যুদ্ধ শেষ হবার পরেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিশেবে আরেক সন্তান জামীকে এগিয়ে দেন তিনি । তাই গঠনগতভাবে স্মৃতিচারণ হলেও আখ্যানের নিরেট বুনন ও টানটান আকর্ষণ এ লেখায় সর্বতোভাবে অনুভব করা যায় ।    

 

 

ড অনিন্দিতা দাশগুপ্ত
এসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ
গুরুদাস কলেজ, কলকাতা
ই-মেইলঃ   aninditadasgupta72@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

রূপকথার ট্যাংরা কলোনি

রূপকথার ট্যাংরা কলোনি
নিরঞ্জনকুমার রায়
খোলাচিঠি, কলিকাতা; ৩৮৪পৃ,
প্রথম প্রকাশ ২০১৭

 

নিরঞ্জনকুমার রায় পেশায় শিক্ষক। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। বনগাঁর অনতিদূরে চড়ুইগাছি গ্রামে লেখক নিরঞ্জন রায়-এর বাস। তাঁর বাড়ি থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত হাঁটা পথে দু’মিনিট। কন্যা ইলা রায়কে বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে। মূল্য-৪০০.০০(চারিশত) দেশভাগ হয়ে গেছে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব জর্জর মানুষ ঠিক করে ফেলেছে এ মাটি আর তার মাটি নয় তাঁকে অন্যকোন নিরাপদভূমিতে আশ্রয় নিতে হবে এই আশাতেই নিরন্ন মানুষেরা মাথায় বোঝা, বগলে পুটুলি নিয়ে চলেছে নিরুদ্দেশ-এর পথে; এমনই চিত্রের প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন, পল্লব রায়। ৩৮৪ পৃষ্ঠার  বই, প্রাপ্তিস্থান খোলা চিঠি, ৬ডি রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা-৯, প্রকাশক তারক দেবনাথ, গ্রন্থস্বত্ব : কিংশুক রায়। বর্ণ অলঙ্করণে : হারাধন দত্ত। মুদ্রণে ঠাকুর হরিদাস প্রিন্টিং প্রেস, বাটার মোড়, বনগাঁ। গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ১৭ আগস্ট ২০১৭

 গ্রন্থের ‘লেখকের কৈফিয়ত/ দুটি কথা’ অংশে লেখক এই গ্রন্থ রচনার দায় স্বীকার করেছেন। সেখানে- ‘এতে তিনটি অংশ আছে’ বলে উল্লেখ করেছেন- ১. ট্যাংরা কলোনির বাস্তব ইতিহাস। ২. নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের সুচিন্তিত সংক্ষিপ্ত কাহিনি। ৩. উপন্যাস অংশ।

 ‘এই ত্রিধারা।’ বলে জ্ঞাপন করেছেন। দেশভাগের ফলে ভারতবর্ষ সুবিধাজনক দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে মূলত এই আশাতেই মানুষেরা এই ভারতভূমিকে বসতি স্থাপনের যোগ্য বলে মনে করেছিলেন। ‘রূপকথার ট্যাংরা কলোনি’ গ্রন্থ নাম হলেও উপন্যাস শুরু হচ্ছে ‘ট্যাংরা কলোনি’ এই শিরোনামে। পরিচ্ছদ সংখ্যা ৬০টি। উত্তর ২৪ পরগনার অঞ্চলজুড়ে একের পর এক উদবাস্তু কলোনি। বনগাঁ, পূর্বতন ২৪ পরগনার প্রাচীন জনপদ। বিভাগ পূর্ব  যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই লেখক নস্টালজিয়ার ইতিহাস চেতনায় বেদনাদীর্ণ আত্মজীবনীমূলক আখ্যান নির্মাণ করতে চেয়েছেন। আগেও বলেছি তিনি পেশায় ছিলেন শিক্ষক এই উপন্যাসের  কেন্দ্রীয় প্রধান শিক্ষকের(Head Master) চরিত্রের নাম সুরঞ্জন সেন। লেখকের নাম নিরঞ্জন রায়। যে কলোনিকে নিয়ে এই কাহিনি আসলে সেই স্থানটি একটি মৌজা মাত্র। বনগাঁ অঞ্চলের আশেপাশে যে সমস্থ ছোট ছোট এলাকাগুলো রয়েছে যেমন- শুটিয়া, চড়ুইগাছি (লেখকের গ্রাম), ঢোঁড়ামারি প্রভৃতি মৌজার কিছু কিছু অংশ নিয়ে তৈরি হয়েছে এই  ট্যাংরা কলোনি। একটি স্কুল এবং তার পরিচালন ব্যস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কেরিকেচারের কলোনি ইতিহাস। কী করে ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে ট্যাংরা কলোনি সেটাই এই আখ্যানের অন্বিষ্ট। মূলাধার হিসেবে কাজ করেছে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়।

 এই কলোনি গড়ার পূর্বে কেমন ছিল এই স্থান লেখক তার প্রাথমিক পরিচয় দিয়েছেন-‘একদা কী ছিল এখানে? ছিল খাল-বিল,জলাভূমি। ছিল কাশবন, বেনাবন, খড়ের বাঁচড়া, উইঢিবি। বিলজমিতে ছিল হোগলা, নলখাগড়া, শোলাগাছও, গড়গড়া বাগান। কেতে-গড়ান জমিতে হত কিছু আমন ধান-শালকেলে,জলাকামিনী,’ হুড়মুড় করে মানুষ যখন এই স্থানে ইতস্তত এসে উপস্থিত হচ্ছে, সেখানে  উলুখড়ের মধ্যে চিনে জোঁক-এর পোয়াবারো অবস্থা। গোরু, মানুষ যে-কোনো প্রাণের সাড়া পেলেই তাঁরা লাফাতে লাফাতে চলে আসতো। রক্ত চুষে খেত। উদ্বাস্তু মানুষেরা অবাধ্য হৃদয়ে তবু এই স্থানকে আঁকড়ে ধরে পড়ে ছিল। সংস্কৃতির রূপান্তরের ভিত্তিতে লেখক পরিবর্তমান সেই জীবনকে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই কলোনি এখন আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়ে সব পেয়েছির দেশ-এ পরিণত হয়েছে।   

 রণবীর ওরফে রুনুই হচ্ছে এই গল্পের নায়ক। স্কুল শিক্ষক। মনোজ হালদারের বাড়িতে লজিং থাকেন এখানেই A History of this colony নামক নিরুপম হালদারের সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁকে সকলে দাদু বলে ডাকেন। এই দাদুই রণবীরকে ট্যাংরা কলোনির নমঃশূদ্র জাতির ইতিহাস-এর গল্প শুনিয়েছেন।

 এই গ্রন্থকে লেখক উপন্যাস বলেছেন; কিন্তু ইতিহাস ও সাহিত্যের যে মিহি সম্পর্ক তার মাঝখানে কোন ভেদরেখা দেখা যায় না। এই গ্রন্থে সেটা মোটা দাগে বিভাজিত হয়ে আছে। আমরা জানি partition literature-এর চর্চাভূমিতে কলোনির ইতিহাস অত্যন্ত উপযোগী। তার মধ্যে ভুক্তভোগী নমঃশূদ্রদের জীবন আরো গ্রহণীয়--- কিন্তু এতদিনে অন্তত তাঁদের প্রবহমান ইতিহাস-এর জন্য বিভিন্ন গ্রন্থ নির্মাণ শ্রেয় ছিল। সে কাজ আজও অসম্পূর্ণ বলেই এসব গ্রন্থ আগ্রহী পাঠককে আকর্ষণ করে।

 

ড উত্তম কুমার বিশ্বাস
সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইলঃ biswasskb7@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

যখন যা মনে পড়ে

যখন যা মনে পড়ে
প্রফুল্ল রায়
দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিট, কলকাতা ৭৩
প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৫, মাঘ ১৪২১
পৃঃ২৭৯  ।। মূল্য : ২৫০ টাকা

 

কথাসাহিত্যিক শ্রী প্রফুল্ল রায়(১৯৩৪-...) অখণ্ড বাংলার ঢাকা জেলায় বিক্রমপুরের আটপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বারো-তেরো বছর বয়সে দাঙ্গা বিধ্বস্ত পূর্ববঙ্গ থেকে দেশভাগের কান্না বুকে নিয়ে ছিন্নমূল হয়ে এসেছিলেন ভারতবর্ষে। তারপর বহু যন্ত্রণার দিনযাপনে চলেছে অস্বিত্ব রক্ষার লড়াই। বেঁচে থাকার যুদ্ধ। তবু স্বপ্নের সেই ভূখণ্ড পূর্ব বাংলা ছিল স্মৃতির মণিকোঠায়। লিখেছেন বহু গল্প-উপন্যাস এবং স্মৃতিকথা।  ‘অকাদেমি’, ‘বঙ্কিম’, ‘শরৎস্মৃতি’ এবং আরও অনেক সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছেন তিনি। কথাসাহিত্যে তাঁর অসাধারণ মানবদরদী মন এবং ফেলে আসা পূর্ববঙ্গের স্মৃতি বারে বারে আত্মপ্রকাশ করেছে। ‘যখন যা মনে পড়ে’ আত্মকথাটি তারই ঐতিহ্যবাহী।

‘সংবাদ প্রতিদিন’ পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’ ক্রোড়পত্রে ‘ছুটি’র পাতায় সাপ্তাহিক একটি কলামে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশিত হয়েছে আত্মকথা ‘যখন যা মনে পড়ে’(১ম পর্ব)। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে রচনাটি গ্রন্থাকারে পাঠকের হাতে এসে পৌঁছায়। ঊনচল্লিশটি শিরোনামে বিন্যস্ত এই আত্মচিত্রণে বারো-তেরো বছরের মুগ্ধমতি এক কিশোরের প্রাণের ভূখণ্ড পূর্ববাংলার স্বপ্নের সেই দিনগুলি হয়ে উঠেছে ‘অজানা গ্রহের রূপকথা’।

চল্লিশের দশকের গোড়া থেকে এই স্মৃতি কাহিনীর সূত্রপাত। প্রেক্ষাপটে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পশ্চিম এবং পূর্ব রণাঙ্গনে তখন মিত্রশক্তির সঙ্গে অক্ষ শক্তির লড়াই চলছে। যদিও ঢাকা, বিক্রমপুরের সেই স্মৃতিজড়িত গ্রামটিতে প্রত্যক্ষভাবে ছিলনা কোন যুদ্ধের আলোড়ন। শান্ত, স্নিগ্ধ, নিরুদ্বেগ সে জায়গা। সবুজ শস্যক্ষেত্র আর আজস্র জলধারায় ঘেরা সে এক আশ্চর্য মায়াময় দেশ। লেখকের কৈফিয়তে জানা যায় জন্মের পর থেকে ধারাবাহিক নয় এ জীবন কাহিনি। ‘যখন যা মনে পড়েছে সেই কালকে সেইভাবে তুলে ধরা হয়েছে স্মৃতির চিত্রপটে’। হয়ত তাই দেশভাগ ও দাঙ্গাবিদ্ধস্ত বাংলার যন্ত্রনাদগ্ধ অভিজ্ঞাত কাহিনির সঙ্গে এ স্মৃতিকথার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বরং স্মৃতিচিত্রণে গহীন সুরে রণিত হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মানবজগতের এক আশ্চর্য মায়াময়বন্ধন।

গ্রন্থটির প্রথম শিরোনামেই এসেছে লাইব্রেরীর প্রসঙ্গ। ‘যোগেশমামা আর লাইব্রেরীর টান চুম্বকের মতো’। শ্রী যোগেশ গুহ মনে করতেন দেশকে বুঝতে হলে সববিষয়ের বই পড়তে হবে। সেই জন্য সেই গ্রামে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা জরুরী। এই আগ্রহ এবং আদর্শ লেখককে সারাজীবন চালিত করেছে। স্মৃতিকথায় কখনো শোনা গেছে মকবুলমামুর গ্রাম জাগানিয়া ডাকের গল্প, জানা গেছে রূপকথার ফেরিওয়ালা ত্রিলোচন কবিরাজের নাড়ী টিপে রোগ নির্ণয়ের আশ্চর্য শক্তির ব্যাখ্যান! কখনো মুগ্ধমতি কিশোর শোনায় প্রমথেশ বড়ুয়া ও কাননদেবীর কল্প উপাখ্যান। আবার কৈশোরকালে পরিনত পর্বে দৈনন্দিন জীবনচর্যার প্রয়োজনে বাজার সংস্কৃতির সঙ্গে লেখকের প্রথম পরিচয়ের অসাধারণ নিপুণ বিশ্লেষণ অনবদ্য ভাবে ব্যাখ্যাত হয় বেশ কয়েকটি শিরোনামে। ক্রমশ সময়ের ধাক্কায় যুদ্ধের আঁচ এসে লাগে। স্পষ্ট হতে থাকে দেশভাগের ইঙ্গিত। গ্রামে সোচ্চার হয়ে ওঠে বিপ্লবী যতীন ভট্টশালীর উপস্থিতি ও দেশ স্বাধীনের আহ্বান। হঠাৎই আনন্দ উচ্ছলময় জীবনের পথে ‘বোমারু বিমানের ঝাঁক অগ্নিকোণে উড়ে যায়’। মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধের ছবি দেখাতে আসে ইংরেজ শাসিত কর্মচারীর দল, সেখানে দর্শক দেখতে থাকে কেবল মৃতদেহের পাহাড়। সংশয় আর দ্বন্দ্বে উত্তাল হয় গ্রামের মানুষ। গ্রন্থটি শেষ হয় রাজেন সেনের প্রসঙ্গে, যাঁরা গ্রাম ছেড়ে আঠারোশ সাতানব্বই সালে বর্মায় চলে গিয়েছিলেন। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষ তাঁদের কথা ভাবছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে বর্মা তখন জাপানিদের আক্রমণে ত্রস্ত। বোমার ভয়ে রেঙ্গুনে ইভাকুয়েশন শুরু হয়ে গিয়েছে। দেশে ওদের বাড়িটার যা অবস্থা ফিরে এলে থাকবে কোথায়? কীভাবে থাকবে? একথাই চিন্তা করছেন তাঁরা।  পূর্ববাংলার মানুষদের এমন গভীর মানবিকতার কথাই লেখকের স্মৃতিচিত্রণে বারেবারে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে। এখানকার মানুষ যুদ্ধ চায় না, মৃতদেহের পাহাড় দেখতে চায় না। দাঙ্গা চায় না। গ্রামের একজন সাধারণ চৌকিদার, অসাম্প্রদায়িক মানুষ মকবুল হোসেনও বিশ্বাস করতে চায় না পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান আলাদা হবে বা হওয়া সম্ভব! তাঁদের সকলের কাছে এ গ্রাম সেই স্বপ্নের ভূখণ্ড! আর তাই আমরা লক্ষ্য করি প্রতিটি মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং প্রকৃতির প্রাণের যোগ নির্মাণ করাই স্মৃতিকথাটির মূল লক্ষ্য।

‘যখন যা মনে পড়ে’(১ম পর্ব) গ্রন্থটিতে লেখক জানিয়েছেন যে, সুচিন্তিত আত্মকথন এখানে নেই। কিন্তু আমরা পাঠকবর্গ লক্ষ্য করি স্মৃতিচিত্রণে ইতিহাস রাজনীতি, সমাজীবন, দৈনন্দিন দিনচর্যা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিটি শিরোনামে অন্বিত হয়ে গেছে। একদিকে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সচেতনতা-সুস্থ্য জীবন যাপনের উচ্ছলতা আবার অন্যদিকে ‘ডাণ্ডি অভিযান’, ‘অসহযোগ’, ‘সত্যাগ্রহ’, ‘আইন অমান্য’ আন্দোলনের প্রসঙ্গ, ভারতরক্ষা আইনের কড়া শাসনের ইঙ্গিত, সমস্তটাই স্মৃতিকথায় গাঁথা হয়ে আছে। ইতিহাস এবং সময় এ স্মৃতিচিত্রণের মূল আধার। একজন মুগ্ধমতি, স্বপ্নদর্শী বারো-তেরো বছরের কিশোর, দর্শক হিসেবে যা যা দেখেছে, বুঝেছে, বিভোর হয়েছে, পাঠকও তেমন ভাবেই মুগ্ধাবিষ্ট হয়েছে পূর্ববঙ্গের জলবায়ু, জীবনযাপন, মানবিক সম্পর্কের স্নেহবন্ধনে! তাই যুদ্ধ, দাঙ্গা বা বিপর্যয় নয়, গ্রন্থটির অমূল্য সম্পদ প্রকৃতি এবং মানবজীবনের মাধুর্যময় দৃশ্যপর্ব! স্মৃতিকথনের এমন ইতিহাসগত চিন্তন পাঠকের কাছে বিশেষ এক প্রাপ্তি।

 

ডঃ মিলি সমাদ্দার
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ
দি ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটি কলেজ, কলকাতা
ই-মেইলঃ  sucharitamili@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

দেশভাগ: স্মৃতি আর স্তব্ধতা

দেশভাগ: স্মৃতি আর স্তব্ধতা 
সম্পাদনা সেমন্তী ঘোষ
গাঙচিল, কলকাতা ।। ২০০৮
মূল্য ৩৫০ টাকা

 

দেশভাগের উত্তর প্রজন্মের লেখক সেমন্তী ঘোষ ইতিহাসের গবেষক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার সময় থেকেই দেশভাগ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ‘দেশভাগ: স্মৃতি আর স্তব্ধতা’ সংকলন গ্রন্থটি সেই আগ্রহেরই ফসল। দেশভাগের পর কেটে গেছে ছয় দশক। বদল এসেছে দু-দেশের জীবন-সমাজ-সংস্কৃতিতে। কিন্তু ম্লান হয়ে যায়নি সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। দুই বাংলার প্রবীণ মানুষরা সেই দেশভাগের লাঞ্ছনা ও পরবর্তী সমাজ-সংস্কৃতির গতিময়তাকে প্রত্যক্ষ করেছেন নিজেদের জীবনাভিজ্ঞতায়। স্মৃতির পথ ধরে সেই সব অভিজ্ঞতার মাননিক বিচ্ছুরণ ঘটেছে সংকলিত প্রবন্ধগুলিতে।

গ্রন্থটির তিনটি ভাগ। প্রথম পর্যায়— ‘স্মৃতি ও প্রেক্ষিত: রাজনীতি, সমাজ, ব্যক্তি’। এই অংশে সংকলিত হয়েছে সাতটি প্রবন্ধ। লেখক: আনিসুজ্জামান (‘ফিরে দেখা: উনিশশো সাতচল্লিশ’), মফিদুল হক (‘দেশভাগ: আমাদের বিষবৃক্ষ’), রণজিৎ রায় (‘পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু: কেন্দ্র রাজ্য দ্বন্দ্ব রাজনীতি’), শিবাজীপ্রতীম বসু (‘ছিন্নমূল রাজনীতির উৎস সন্ধানে’), জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায় (‘মেয়েলি জীবন, ভাগাভাগির পরের যুগ’), বিপ্লব বালা (‘যে গাছ রুয়েছি তার এই ফল হবে: যারা থেকে গেলাম’), অভীক মজুমদার (‘শুধু কি মুখের বাক্য?: যাঁরা থেকে গেলেন’)

আনিসুজ্জামানের প্রবন্ধটি ইতিহাসের কালচিহ্ন ও তথ্যসম্বলিত রচনা। মফিদুল হকের প্রবন্ধটিও সেই ইতিহাসেরই প্রলম্বিত রূপ —পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়ে ওঠার কাহিনি। বিভাজন পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা, রাজনৈতিক চাপান-উতোরের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে রণজিৎ রায়ের নিবন্ধে। স্মৃতির পথ ধরে ছিন্নমূল রাজনীতির সন্ধান করেছেন শিবাজীপ্রতিম বসু। ভিটেমাটির সঙ্গে চব্বিশঘন্টা সম্পৃক্ত মেয়েদের জীবন দেশভাগের পরে কি অবস্থায় এল, তার মননশীল বর্ণনা আছে জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধে। দেশভাগের পরে দেশত্যাগ না করে যাঁরা পুরোনো ভিটেমাটিতেই রয়ে গেলেন তাদের চারপাশের বদল তাঁরা কীভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন সে বর্ণনা উত্তম আর প্রথমপুরুষের জবানবন্দীতে রয়েছে বিপ্লব বালা এবং অভীক মজুমদারের নিবন্ধ দুটিতে।

গ্রন্থটির দ্বিতীয় পর্যায়— ‘স্মৃতি ও ইতিহাস: স্মৃতি, বিস্মরণ, নীরবতা, উচ্চারণ’। এই অংশে পাঁচটি নিবন্ধই স্মৃতি নির্ভর। দক্ষিণারঞ্জন বসু সম্পাদিত ছেড়ে আসা গ্রাম গ্রন্থটিকে দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর গবেষণার অন্যতম আকর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এই অংশের প্রথম নিবন্ধটি তাঁর ‘মেমরিজ অব ডিসপ্লেসমেন্ট: দ্য পোয়েট্রি অ্যান্ড প্রেজুডিস অব ডুয়েলিং’ অধ্যায়ের শোভন তরফদারকৃত অনুবাদ ‘বাস্তুহারার স্মৃতি ও সংস্কার: ছেড়ে আসা গ্রাম’। অন্য প্রবন্ধগুলির লেখক অশ্রুকুমার সিকদার (ভাঙা বাংলার সাহিত্য), মৈনাক বিশ্বাস (‘এক অসহনীয় ইতিহাস ও সিনেমার সাহিত্য’), বিশ্বজিৎ রায় (‘ইতিহাসে পরিগ্রহণ: দেশভাগের স্মৃতিকথা’) এবং সৌরিন ভট্টাচার্য (‘ইতিহাসের উলটো দিক’)। স্মৃতির সূত্রে কিছু তথ্য এবং কিছু তত্ত্বে একেকটি প্রকাশমাধ্যমের দিগন্তকে স্পর্শ করেছে এইসব নিবন্ধগুলি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রবন্ধের নামকরণের মধ্যেই রয়েছে বিষয়বস্তুর ইঙ্গিত। স্মৃতি নিয়ে দেশভাগের ইতিহাস রচনার পদ্ধতিগত সংকটের একটি জরুরি পরিক্রমা পাওয়া যায় বিশ্বজিৎ রায়ের লেখায়। আর সৌরিন ভট্টাচার্য দেশভাগের স্মৃতিমূলক ইতিহাসকে তাঁর রচনায় বুনেছেন এক উল্টোচিন্তার (counter-factual) বুনোটে —এ এক নতুন আঙ্গিক।

গ্রন্থটির শেষাংশে আছে দেশভাগ সম্পর্কিত কিছু কবিতা, আঁকা ছবি-শিল্পকর্ম এবং চলচ্চিত্রের স্থিরচিত্রের সংকলন। সংখ্যায় কম হলেও গ্রন্থটির অলংকরণে তা এক অন্য মাত্রা দান করেছে।

 

কস্তুরী মুখোপাধ্যায়
সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
দি ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটি কলেজ, কলকাতা
ই-মেইলঃ kasturi2314@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU

বিপন্ন কালের ভেলা

বিপন্ন কালের ভেলা
উমা বসু
গাংচিল, কলিকাতা ।। ডিসেম্বর, ২০১১
২০০টাকা

 

উমা বসুর স্মৃতিকথা ‘বিপন্নকালের ভেলা’ গ্রন্থটির সম্পাদনা করেন ঝর্ণা বসু। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বইটি গাঙচিল থেকে প্রকাশিত হয়। যার মূল্য নির্ধারিত হয় ২০০ টাকা। এর আগে ২০১১ সালে রচনাটি বাংলাদেশের ‘সাহিত্য প্রকাশ’ থেকে ‘অবরুদ্ধ অশ্রুর দিন’ এ ‘যে আলোয় পথ দেখেছি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। যার সম্পাদনা করেছিলেন মফিদুল হক ও ঝর্ণা বসু। এরপরে আরও কিছুটা পরিমার্জিত রূপে গাঙচিল থেকে নতুন শিরোনামে বইটি প্রকাশিত হয়।  

গ্রন্থ লেখিকা উমা বসুর জন্ম ১৯২৮ সালের ৩রা জানুয়ারী খুলনা জেলার মূলঘরে। রাষ্ট্রবিপ্লবের ঘাত প্রতিঘাত এই মানুষটি সামলেছেন প্রায় গোটা জীবন ধরে। রাষ্ট্রনৈতিক সমস্যা এঁকে বারে বারে তাড়িয়ে খাদের ধারে নিয়ে গেছে। কিন্তু উমা বসু প্রতিবারই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। লড়াই করেছেন বীরাঙ্গনার মতোই। জীবনের শেষ পর্বে এসে তিনি লিখেছেন তাঁর জীবনেরই সেই সব কথা। লেখিকার লেখনীর স্পর্শে যা প্রাণবন্ত রূপ পেয়েছে। ২০১৪ সালের ১৬ই নভেম্বর কলকাতার এর নার্সিংহোমে উমা বসুর জীবনদীপ নির্বাপিত হয়।

বইটিতে কোনও অধ্যায় বিভাজন দেখাননি সম্পাদিকা ঝর্ণা বসু। আত্মকথার ঢঙে খুব সাবলীল গদ্যে উমা বসু তাঁর জীবন কথার বিনি সুতোর মালা গেঁথেছেন। বইটির শুরুতে সম্পাদিকা ঝর্ণা বসু ও বাংলাদেশের ভূমিকন্যা সাগুফতা শারমীন তানিয়ার দুটি মুখবন্ধ আছে। যে লেখাদুটি বইটির প্রতি মানুষের আগ্রহকে নিঃসন্দেহে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

 বাংলা সাহিত্যে দেশভাগ কেন্দ্রিক স্মৃতিকথা রচনার যে আধার রয়েছে তার মধ্যে ‘বিপন্নকালের ভেলা’ গ্রন্থটি একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন। বাস্তব যে কতটা রূঢ় ও মর্মস্পর্শী তা বইটি পাঠ না করলে বোঝা যাবে না। ১৯৩৯ এর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। প্রায় তিরিশ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী উমা বসু। যুদ্ধের আঁচ মেখে বেড়ে ওঠার সময়ই মেয়েটি বুঝেছিল পরাধীনতার গ্লানিকে। এরপর ১৯৪৪ এ বিয়ে করে তিনি চলে আসেন বাগেরহাটে। তারপর থেকে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে চলে নানা রকমের অনিশ্চয়তা। চোখের সামনে দেখেন দেশভাগ ও তার ভয়াবহতাকে। বারে বারে পালিয়ে বেড়াতে হয়। দেশভাগের পর জানা যায় খুলনা পাকিস্তানের অন্তর্গত। ধর্মের ভিত্তিতে রাতারাতি সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া হিন্দুরা তখন পালাতে বাধ্য হয়। উমা বসুও তখন একান্ত আপন পরিবেশ ছেড়ে বিহারে কাকার কাছে থাকতে বাধ্য হন। স্বামী ব্যবসার কাজে থেকে যান খুলনা জেলার বাগেরহাটে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর উমা বসু সেখানে ফিরে এসে সবে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন তখনই শুরু হয় ভয়ঙ্কর দাঙ্গা। পাকিস্থান সরকারের মদতে হিন্দু পরিবারের উপর চলে লুটপাট, অসম্মানিত হয় মেয়েরা। পূর্ব পাকিস্থান জুড়ে চলে অরাজকতা। সন্তানদের নিয়ে পরিবারের সঙ্গে উমা বসু কলকাতায় চলে আসেন। এরপর ১৯৫০ এর নেহেরু লিয়াকত চুক্তির পর আবার সপরিবারে বাগেরহাট চলে যায় উমা বসুর পরিবার। কিন্তু বেশিদিনের জন্য নয়। ১৯৫২ সালে পাসপোর্ট চালু হওয়ায় যখন দেশত্যাগের হিড়িক পড়লো তখন আবার জায়গা পরিবর্তন করে তাঁদের চলে যেতে হল দেওঘরে। দেওঘরে বসে বাগেরহাটের সুখ স্মৃতি লেখিকাকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রনা দিত। এর বেশ কিছুদিন পর বাগেরহাটে তাঁরা ফিরে এলেও নানা অশান্তি জীবনে একের পর এক আসতে থাকলো। উমা বসুর স্বামী  ভোলানাথ বাবুর নানা রকম ব্যবসায়িক বিপর্যয় দেখা দিল।এরপর চৌষট্টির ভয়াবহ দাঙ্গা।তারপর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।এভাবে একের পর এক বিপর্যয় ভেঙ্গে চুরে দিয়েছিল মানুষটিকে।তারই মধ্যে চোখের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাগেরহাটে রাজাকারদের হাতে তার স্বামীর মৃত্যু হয়। ছেলে মেয়েদের আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান তিনি। বাড়ির বড় ছেলেদের পালিয়ে বেড়াতে হয়। এভাবেই দিন যায়। আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। উমা বসুর চোখের সামনে আত্মসমর্পণ করে স্বামীহন্তা এনায়েত। তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। অন্যদেরও বারণ করেন তার সন্তানদের অনাথ করতে। এভাবেই বুক ফাটা কান্নার দলিল হয়ে যায় উমা বসুর স্মৃতি কাহিনি।

কথকতা লেখ্য রূপ পেলে তাকে অনেক মার্জিত করতে হয়। এক্ষেত্রেও তা করতে হয়েছে তবু উমা বসুর স্মৃতিকথনের মধ্যে যে হৃদয়ের যে মর্মস্পর্শী রূপ খুঁজে পাওয়া গেছে তাকে অস্বীকার করা যায় না।    

 

ড. আত্রেয়ী সিদ্ধান্ত
ইন্দাস মহাবিদ্যালয়, বাঁকুড়া
ই-মেইলঃ aatreyi.siddhanta@gmail.com

 

Review Copyright@ All rights reserved with the CLTCS, NSOU